এক নিরিবিলি মানুষ অগভীর পুকুরের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে, এক পা জলে, এক পা ঠান্ডা মাটিতে আলতো চাপা। তার হাতে দুটি পেয়ালা একটা থেকে অন্যটায় তরল কাত করে, এক সাবধানে ধারা। ওপরে সকালের বাতাস গলনের গন্ধ আর শিশিরের ক্ষীণ ঝিলিক বয়ে আনে, যেন একটা মেঘ এইমাত্র ঘাসে কেঁদেছে। যে ধারা সে ঢালে, তা তাড়া করে না, ছিটকায় না, ধীর মেশানোয় শান্তি পায়। ওপারে এক সরু পায়ের পথ নলখাগড়া আর বুনো পুদিনার ভিতর দিয়ে এঁকে যায়, দূরের ঢালের দিকে, সূর্যের প্রথম আলোয় ধুলোমাখা।
পুরনো গল্পে মিশরের মরুতে এমন পাথর আছে, যুগ যুগ ধরে জলের অপেক্ষার ধৈর্য জানা হাত যাদের কেটে মসৃণ করেছে। নিশাপুরের খনি থেকে বণিকেরা নদীর ঘষা নুড়ি পেত, ভোরের পাহাড়ি হ্রদের সমান রং, উটের সারিতে রেশম পথের গিরিপথ পেরিয়ে নিয়ে যেত। মেসোআমেরিকার মন্দিরে খোদাইকারীরা সেই একই পাথর পুঁতিতে গড়ত, মৃতের ঠোঁটে চেপে দেওয়া হত, নিরাপদ পথের প্রতিশ্রুতি। প্রতিটা বাণিজ্যপথ, প্রতিটা নিরিবিলি কর্মশালা, এমন জায়গা হয়ে উঠত যেখানে উপাদানকে মিলতে প্ররোচনা দেওয়া হত। মাটি থেকে তোলা তামা, চুনাপাথরের গুঁড়ো, অঙ্গারের ওপর ফেলা মানুষের এক নিশ্বাস, সরু পাক হয়ে ওঠা ধোঁয়া। ফল ধাতুও হত না পাথরও হত না, দুটোরই ইশারা। শক্ত, তবু নরম, যেন আকাশ হাতে এক টুকরো ধার দিয়েছে।
খামারবাড়ির ভিতরে ভোরের আলো জানালার কাচ দিয়ে ঢুকে এক চীনামাটির বাটিতে ঝিলমিল করে, তার গায়ে একই জলের মতো প্রলেপ। বাটিটা এক কলসির পাশে শোয়, দুজনেই ধোয়ার জায়গায় নিজের পালার অপেক্ষায়। কাছেই এক নরম শাল, রেশম আর শণ দিয়ে বোনা, এক সিন্দুকে ভাঁজ করা। তার সুতা ভূমধ্যসাগরের খনিজভরা অগভীর জলের কথা মনে করায়, যেখানে এককালে ডুবুরিরা বেচাকেনার জন্য টুকরো তুলত, আর তাঁতিরা এক মঠের লিপিকারের ধৈর্যে রং মেশাতে শিখেছিল। উনুনের ওপরে এক মাছরাঙার পালক এক কাঠের আড়ে পিন করা, পথিকের এক চিহ্ন, হিমবাহের স্রোতের ধারে মাছ ধরে বাড়ি আনা, যেখানে নদী সমতলে মেশে তার অনেক উজানে।
সংযম মেশানোর কাজ। বাইরের আবহাওয়া দয়াবান। মৃদু বৃষ্টির রাতের পর আকাশ পরিষ্কার করে আঁকা, বাতাসের কিনারা শুকনোও নয় ভারীও নয়, ঠিক এমন করে সাম্যে। পাথুরে পথ ধরে বুনো ভুলে-যেও-না আর সেজঝোপ একে অপরের গায়ে চেপে থাকে, শিকড় তলার নিচে জট পাকানো, একই মাটির টুকরো থেকে যার যা দরকার তা টানে। পুকুরের ধারে ফড়িং ভেসে থাকে, ডানা আলোয় কাঁপে। প্রাচীন রসায়নসাধকেরা তাদের কলার নাম দিয়েছিল জলের ধৈর্যশীল চক্রের নামে। গোলানো, মেশানো, নিংড়ানো, আবার মেলানো। এটা জগতের প্রতিদিনের কাজ, আত্মারও তাই।
আজ একজন ঠান্ডা ঝরনার জলে এক পেয়ালা ভরে আলতো অন্য পেয়ালায় ঢালতে পারে, মসৃণ ধারা দেখে। পুরনো গয়নার এক টুকরো ঘষে চকচকে করতে পারে, আঙুলের গায়ে মসৃণ পাথরের ছাপ বুলিয়ে, যে হাত একে গড়েছিল তাদের মনে করে। বাইরে হাঁটতে গত রাতের বৃষ্টিতে পড়া এক ডোবার পাশে থামতে পারে, তলে আকাশের আয়না দেখে, মেঘ পায়ের আঙুলের ফাঁকে ভেসে যায়। বা ঘরে এক স্কার্ফে নিজেকে জড়াতে পারে, নরম বয়ে চলা বাতাসের শান্তি টানতে পারে। বেশি গরমও নয়, বেশি ঠান্ডাও নয়। তারপর দিনের সঙ্গে দেখা করতে বেরোতে পারে।
আজকের ভাগ্যের রং ফিকে ফিরোজা।
Lucky Color: PaleTurquoise — #AFEEEEজল আর মাটি মিশুক। চুপচাপ কাজটাই যথেষ্ট হোক।