একজন মানুষ জীবন্ত গাছ থেকে ঝুলছেন। যন্ত্রণায় জড়ানো নয়, এমন এক ঝুলন যা ছেড়ে দেওয়া আর নতুন দেখা, দুটোই বলে। মাথার উপরে একটা আলোর বলয়, শান্ত আভা, যা জ্বলে ওঠে না, আস্তে স্পন্দিত হয়, যেন প্রাচীন কুঞ্জের নিচের নিস্তব্ধতারই অংশ। জগৎ উল্টে গেছে। আকাশের জায়গায় মাটি, ডালের জায়গায় শিকড়। এই স্থিরতায় গাছের ডাল কাঁপে না, চুপচাপ নিজের গোপন কথা আগলে রাখে, আর একটা মৃদু হাওয়া বয়। বদল তাড়াতে নয়, এই থামাকে আরও স্পষ্ট করতে।
এককালে এমন ডাল থেসালির পাহাড়ে গজাত, যেখানে মানুষ ফল চেপে তেল বের করত, ফিকে ও তেতো, মাটির কলসে জমাত। কুঞ্জগুলো বন্য দেশ আর সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকত, পাতায় শুকনো আবহাওয়ার ধুলো জমত। বলা হয়, অ্যাথেনার শহরকে দেওয়া দান ছিল গাছটাই, প্রতিযোগিতায় পাথর থেকে গজানো, শান্তি ও পুষ্টি দুটোরই প্রতিশ্রুতি। কাঠ হয়ে গেল কৃষকের রেকের হাতল, তেল চাপার কপিকল, বণিকের মাপকাঠি। ফল, পাকিয়ে লবণজলে রাখা, চুপ ছাদের নিচে কাঠের তক্তায় থাকত, অথবা অসুস্থের জন্য বাটা হতো। গাছ যেমন প্রতি বছর থামে, পাতা ও ফল পাকার আগে নিস্তব্ধতায় ঝুলে থাকে, ঝুলন্ত মানুষও তেমনি থামেন। জগৎকে তার পথে চলতে দেন, নতুন বোঝা বসার অপেক্ষায়।
গাছের ছায়া একটা কাজের আশীর্বাদ, ডালের নিচের জগৎ পুরোনো লাগে, যেন দুপুরের গরমে সময় ধীর হয়। ডালের নিচে বাগানের সীমানা চিহ্নিত করতে পাথর স্তূপ করা, শ্যাওলায় ঢাকা, কেউ নাড়াচাড়া করেনি। এখানে এক বণিক হয়তো বিশ্রাম নেন, পাশে বোঝা, দূরে বাজার চত্বরের ডাক শোনেন। এখানে এক শিশু হয়তো পড়া ডাল উল্টে দেখে, অলস আঙুলে খাঁজ আর গিঁট বুলোয়, গাছ কী গল্প বলতে পারে তা ভাবে। ভোরবেলা পাতায় শিশির জমে, বাতাসে লবণ আর মাটির মৃদু গন্ধ, ফসল আনতে যে দীর্ঘ ধৈর্য লাগে তার মনে করিয়ে দেওয়া।
পুরাণে ডাল ছিল যুদ্ধবিরতির চিহ্ন, দৌড়ের লোকেরা শুকনো সমতল পার হয়ে নিয়ে যেত, হিংসা থামানোর ইশারা। কিংবদন্তিতে সে দেখা দিত, কোনো যাত্রা শেষ হয়েছে, অথবা কেউ জ্ঞান খুঁজতে এসেছে, ছায়ায় অপেক্ষায় প্রস্তুত, যতক্ষণ না উত্তর নিজে খোলে। আজও এমন জায়গা আছে, যেখানে কাঠ কেটে পুঁতি বানানো হয়, ঘরের দরজায় গেঁথে, অমঙ্গল আটকাতে। হাতে চেপে ছোট পিঠে বানানো হয়, অতিথির জন্য টেবিলে রাখা, আতিথেয়তার চিহ্ন, অথবা সকালের রুটির জন্য বাটা, স্বাদ ঝাঁঝালো ও দীর্ঘ। গাছের ধীর বাড়া ঝুলন্ত মানুষের স্থিরতায় ফেরে। তিনি লড়াইয়ে নয়, থামায় দৃষ্টি পান।
এই গল্প থেকে চুপচাপ কিছু কাজ আসে। শক্ত সেঁকা রুটি নিন, লবঙ্গ আর চাপা ফল মাখিয়ে, খোলা জানালার নিচে চুপ করে খান। রোদের এক টুকরোতে দাঁড়ান, মাথার উপরের পাতায় হাওয়া শুনুন, চিন্তা আসা-যাওয়া করুক, বিচার ছাড়া। টেবিলের ওপর একটা ডাল রাখুন, দিনের কাজে ঝাঁপ দেওয়ার আগে থামার মনে করিয়ে। একটা বিচি হাতের তালুতে ধরুন, তার ভার অনুভব করুন, তারপর মাটিতে পুঁতুন। ছোট এক বিশ্বাস, লুকোনো কিছু একদিন উঠবে।
আজকের ভাগ্যের রং জলপাই।
Lucky Color: Olive — #808000থামা শেষ নয়, একটা মোড়।
যা স্থিরতায় গজায়, একদিন আপনাকে আশ্রয় দিতে পারে।