মেঘের ওপর একটা তূর্য বাজে, স্পষ্ট, টলে না। তার ডাক ছড়িয়ে যায় এমন এক ভূমিতে, যেখানে কফিন সদ্য খুলে পড়ে আছে, আর ডাকের অপেক্ষায় মানুষ দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তটা বিভ্রান্তির নয়, নিশ্চিতির। বাতাস বয়ে আনে অনেকদিন ধরে অপেক্ষিত এক আগমনের ভার। ঘুম আর জাগার মাঝের ফাঁকে প্রত্যেকে ডাকের দিকে ওঠে, হাড়ে আর শ্বাসে সেটা টের পায়। এভাবে ডাক পাওয়া মানে কোনো জরুরি কথা মনে পড়া, এক বিরাট খুলে যাওয়ার মাঝখানে দাঁড়ানো।
তূর্যের ডাক জায়গা আর কালের সীমা পেরোয়, পাহাড়ি খাঁজে আর নদীর উপত্যকায় প্রতিধ্বনি তোলে। যেখানে ঝরনা নুড়ির ওপর দিয়ে ঠান্ডা বয়ে যায়, মানুষ ধৈর্য ধরে কোনো দামি জিনিস ধুয়েছে, হাত অবশ, তবু আশা আছে। মাটি নিজেই এমন পাথর তুলে দিয়েছে, যা ঠিক আলোয় বদলের প্রতিশ্রুতি দেয়, খোঁজার মানুষের জন্য এক নতুন শুরু। প্রাচীন দিনের শহরের হাটে সেই ছোট পাথর হয়ে গেল শাসকের মুখ চাপা চাকতি, হাত থেকে হাতে ঘুরল। এই মুদ্রা রুটি আর আশ্রয় কিনেছে, আবার ইচ্ছেও বয়ে নিয়ে গেছে, অনুষ্ঠানে বদল হয়েছে, সঞ্চয়ের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সাম্রাজ্য আর দূরের গ্রামের পথের মাঝে বণিকেরা বাতির আলোয় সেগুলো গুনত, পেরোনো প্রতিটা দূরত্ব চুপচাপ একগুঁয়ে মনে রাখত।
দূরের রাজ্যে পুরাণ আর উচ্চাশা একসঙ্গে জড়িয়েছিল। এক কিংবদন্তির মেষলোম, রাতদিন পাহারায়, সাহসী বা চালাক যে দাবি করতে পারবে তাকে ক্ষমতা দেবে, এমন কথা ছিল। মুকুট যত্ন করে পিটিয়ে বানানো, দুর্লভ পাথর বসানো, রাজাদের কপাল ঘিরে রাখার জন্য। ক্ষমতার চিহ্ন, আর চলতে থাকার প্রতিশ্রুতি। ধাতু বদলানোর কারিগরদের ঘরে চুল্লির আভায় আশা কাঁপত। সেখানে সাধারণ ধাতু নাড়ানো হত, নজর রাখা হত, বাতাস ভরা উচ্চাশা আর গোপনতার গন্ধে। উৎসবের দিনে পরিবার বিশেষ রুটি বানাত, ভেতরে একটা ছোট চমক গুঁজে দিত, বিশ্বাস করত ভাগ্য তাকেই খুঁজে নেবে যে সেটা বের করবে।
প্রকৃতি তূর্যের গানের জবাব নিজের মতো দেয়। ঝড়বৃষ্টির পর রোদ ফিরলে গমের ক্ষেত ঝলমল করে, যেন সবই ধনে বদলে গেছে, প্রতিটা ছড়া এক সরু প্রতিশ্রুতি। বিকেলের শেষে জানালার কাচ দিনের শেষ উষ্ণতা ম্লান ঘরে ফেলে, পুরনো আসবাব আর ঘরের স্মারককে নরম আলোয় ভরিয়ে দেয়। শান্ত উপাসনালয়ে মোমদান প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে, ছোট শিখা ধরে, দেয়ালে নাচের নকশা ফেলে। মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার ঋতু পেরিয়েও আলো টিকে থাকে।
ঘর এই উজ্জ্বলতা নানা আকারে জড়ো করে। এক প্রিয় আংটি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরতে পরতে মসৃণ, কাঠের বাক্সে বসে। তার গায়ে একদা বলা প্রতিজ্ঞার ফিসফিস। একটা মুদ্রা, ভ্রমণ থেকে বাঁচানো বা জন্ম চিহ্নিত করতে দেওয়া, চিঠি আর ছবির মাঝে লুকানো। তার থাকাটা এক নীরব স্মৃতি। মধু বয়াম থেকে চামচে সকালের জাউ বা চায়, প্রথম আলোয় জ্বলে, সামনে যা আসছে তাকে মিষ্টি করে। দূরের ক্ষেতে আবহাওয়ায় ক্ষয়ে যাওয়া এক কাস্তে গোলাঘরের দেয়ালে ঝোলে, তার ফলা সূর্যের পথ আঁকে, আরেক ফসলের অপেক্ষায়।
দৈনন্দিন জীবনের শান্তিতে ছোট কাজ ডাকটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। আঙুলে একটা আংটি পরে নিন, সে যে প্রতিজ্ঞা বয়ে আনে সেটা মনে রাখুন। ভেতরে লুকানো একটা চমক দিয়ে রুটি বানান, যাকে ভালোবাসেন তার সঙ্গে ভাগ করুন। সন্ধ্যায় টেবিলে একটা মোমবাতি বসান, একটু থেমে তার শিখা দেখুন। যখনই দরজা পেরোন, ভাগ্যের জন্য একটা পুরনো মুদ্রা ছুঁয়ে নিন। তার ভার আপনাকে মনে করিয়ে দিক, এখনও কত যাত্রা অপেক্ষা করছে।
আজকের ভাগ্যের রং সোনালি।
Lucky Color: Gold — #FFD700ডাকটা আপনার ভেতরে যা অপেক্ষা করছে তাকে জাগাক।
আলোর মধ্যে পা বাড়ান।