আধো আলোয় একটা পথ দুই মিনারের মাঝ দিয়ে চলে যায়, যেখানে সমুদ্র ডাঙার গায়ে এসে নিশ্বাস নেয়, আবার সরে যায়। একটা কুকুর ডাকে, গলা স্থির, চেনা। পাশে নেকড়ের বুনো চোখ জোয়ারের বদলানো কিনারা দেখে। নোনা হাওয়া ওঠে, প্রশ্ন নিয়ে, আর মিনারের পাথরও যেন অনিশ্চিত, সকালের উত্তরের অপেক্ষায়। সামনের পথ সত্যি, কিন্তু শুধু টুকরোয়। প্রতিবিম্বের এক ঝিলিক, কাদায় এক পায়ের ছাপ, ভোরের আগে বাতাসের শান্ত। এখানে পৃথিবী ফাঁকা নয়। সে চিহ্ন জড়ো করে। সরে যাওয়া জলের ফেলে যাওয়া মাছের আঁশ, পলিতে ঝিকিয়ে ওঠা হারানো বোতাম, রান্নাঘরের মেঝেতে পড়ে আলমারির কিনারার তলায় আটকে থাকা একটা পুরোনো চামচ।
প্রাচীন কালে তীরের পথ মাপত তারা, যারা পিটানো পাত আর ছোট গয়না নিয়ে চলত, সূর্য ওঠার আগে বেরোনো ব্যাপারী। তারা চাঁদের আলোয় স্রোত দেখত, নদীর উপরিতল দিয়ে ঝুঁকি মাপত, ঢেউ খুঁজে। পুরোনো দুনিয়ার ব্যাপারীরা মাল জড়াত, আয়না, তার, মুদ্রা, শণের কাপড় আর তেলমাখা কাপড়ে মুড়ে, ফ্যাকাশে মাশরুমের পাশে ঝোলায় গুঁজে রাখত, মাশরুমের টুপি মসৃণ আর ঠান্ডা। দীর্ঘ রাতে চাঁদের প্রতিবিম্ব তাদের সঙ্গে হাঁটত, সন্দেহে সঙ্গী, সুযোগেও। শহরে কামারের হাতুড়ি গলিতে গমগম করত, পেয়ালা, আংটা, আর সেই সরু শিকলের টুকরো গড়ত, যেগুলো থলির মুখ বন্ধ করে। চুল্লির পাশে একটা ছোট পাত্র ছিল, ফোঁটা ধরত, যখন কেতলি ঠান্ডা হয়ে তার হালকা, চকচকে অবশিষ্ট ফেলে যেত।
চাঁদের জগৎ পাতলা, প্রশ্নের ধার দিয়ে ঘেরা। এখানে আলো ফাঁকি, জলের উপর একটা রেখা, বা নলখাগড়ার ফাঁকে একটা পথ। গল্পকাররা বলত জোয়ারের ত্বকের তলায় মিলিয়ে যাওয়া মাছের দ্রুত ছোঁড়ার কথা, বা শেয়ালের ছায়ার কথা, যা ঠিক তখন বেড়ার আড়ালে গলে যায় যখন একটা মেঘ সরে যায়। বন্দরে কুয়াশা কখনো জাহাজের ডেকে জমত, লণ্ঠনের ছায়া আর পকেটের ঘড়ির ছোট কব্জা ঢেকে। ওপারের পাহাড়ে ভূর্জের ঝাড় একসঙ্গে দাঁড়াত, বাকল সন্ধ্যায় চকচক করত, ঘাস শিশিরে ভেজা। পথিকরা নিশানিতে সান্ত্বনা নিত। হাতের তালুতে চাপা একটা আংটি, ঘুমের কাথা নাড়ার পুরোনো চামচ, স্মৃতি ধরে রাখতে শক্ত করে পেঁচানো সুতো। ঘরের ভিতরে একজন নারী তার চুল বেঁধে নিতে পারতেন দাদির বিয়ের পোশাক থেকে কাটা ফিতায়, কাপড়টা উৎসবের রাত আর তার পরের শান্ত মনে করিয়ে দিত।
আবহাওয়াতেও পৃথিবী এই দিকের প্রতিধ্বনি করে। পুকুরের কিনারায় তুষার জমে, একটা পাতলা ধার, আঙুল দিয়ে ছোঁয়া যায়, কিন্তু ঠিক ধরা যায় না। বাতাস বদলের প্রতিশ্রুতিতে চিড় ধরে। বৃষ্টি হয়তো, বা কুয়াশা, বা প্রথম তুষারের আগের শান্ত। বাগানে পাতার নিচের পিঠ প্রথম ফোঁটা ধরে, আর কেউ হাঁটু গেড়ে একটা পাথর ওলটায়, পোকার পিঠের ঝিলিকে চমকে যায়। রাত গভীর হয়, কিন্তু কোথাও না কোথাও সবসময় একটা প্রতিবিম্ব থাকে। বাইরে ফেলে রাখা বালতিতে, রাস্তার কিনারায় জমা জলে, বাসন ধোয়ার জায়গার পাশের কড়াইতে, আকাশের স্মৃতি ধরে।
আজ রাতে আপনি একটা পুরোনো চামচ ততক্ষণ মাজতে পারেন যতক্ষণ না সে চকচক করে, অথবা একটা স্মৃতির মুদ্রা রুমালে জড়িয়ে হাঁটার সময় পকেটে রাখতে পারেন। বিছানার পাশে একটা ছোট আয়না রাখুন, ঘুমের আগে চাঁদের চাহনি ধরে। একটা গোপন আশা লিখে কেতলির তলায় গুঁজে দিন, ভোর ঘনিয়ে আসলে বাষ্প আপনার ইচ্ছেকে উপরে তুলে নিক।
আজকের ভাগ্যের রং রুপালি।
Lucky Color: Silver — #C0C0C0মাঝপথের জগৎ আলোর ধারে ঘেরা। প্রতিটি প্রতিবিম্ব একটা পথ ধরে রাখে।