একসময় টেবিলের মাথায় এক পুরোনো চেয়ার ছিল। তার হাতল চওড়া, পেছনের পায়ে দাঁড়ানো সিংহের মূর্তি খোদাই, কিন্তু আসন এখন উঁচু জানালার নিচে খালি। যে গর্তে শাসকের হাত থাকত সেখানে ধুলো জমেছে, আর পিঠ সকালের হাওয়ায় ক্যাঁচ করে। বড় ঘর, পাথরের মেঝে, লোহার খিল, শুধু পায়ের শব্দের প্রতিধ্বনি ধরে। চারপাশে শৃঙ্খলা টিকে থাকে। দেয়ালে পেরেক মারা মানচিত্র, পিতলের দাঁড়িপাল্লা অনড়, দিনের খতিয়ান খোলা কিন্তু লেখা হয়নি। তবু কোনো কিছু এই জিনিসে কর্তৃত্বের নিশ্বাস দেয় না। রীতি থাকে, নিজের জন্যই আওড়ানো। এখানে অনুষ্ঠান ফাঁপা, আর রূপই আইন।
এই দেয়ালের বাইরে এক বাসাল্টের পাহাড় ওঠে। কুয়াশার চাদরের নিচে নিজের গোপন কথা রাখে। শত বছর আগে পথিকরা ঠান্ডা লাভায় নিজের নাম খোদাই করত, টিকে থাকা কিছুর অংশ হিসেবে মনে রাখা হওয়ার আশায়। এখন চূড়ার পথ পিছল, অগুনতি জুতোয় ক্ষয়ে যাওয়া। পাহাড় দাঁড়িয়ে, নীরব আর উদাসীন, হৃদয়হীন কাঠামোর স্মৃতিস্তম্ভ। ঢালের কোথাও এক কাক খালি ডালে নামে, ডানা আঁট করে গোঠায়। ঠোঁট থেকে কোনো গান বেরোয় না। কাচের মতো প্রাচীন চোখে দেখে। কাক রাজাদের জন্য এখানে নয়, শুধু সকাল আর রাতের ছাঁচের জন্য।
হাটের চকে এক কয়লাবণিক ছোট ভিড়ের সামনে ডেলা ওজন করে। প্রতিটি টুকরো কালো, ঝকঝকহীন, শক্ত কোণে চেপে। বেচাকেনা সৎ, কিন্তু অভ্যাস। মাপা, হাতে দেওয়া, ধুলো ঝাড়া। লেনদেনে উষ্ণতা নেই, শুধু প্রক্রিয়ার ঠান্ডা নির্ভরযোগ্যতা। পরে এক দর্জি ঘরে ফেরে, জানালার ধারে গাঢ় কালো কাপড়ের থান খোলে। আনুষ্ঠানিক জামার আকার কাটে, নিখুঁত রেখা সেলাই করে। তার হাত স্থির, মন অন্যত্র। জামা আলমারিতে ঝুলবে, এমন উপলক্ষের জন্য রাখা যা নিয়মের সম্মান চায়, ভেতরের মানুষের নয়।
কোথাও নদীর ওপর বজ্রঝড় ঘোরে। আকাশ চেপে আসে, ঘন আর ঘূর্ণায়মান, নিচের জগৎ ম্লান আর অপেক্ষমাণ। ছাঁচ প্রাচীন। জমা, ছাড়া, তারপর শান্ত। নদী ফোলে, তার উপর কোনো খুঁটিনাটি ফেরায় না, শুধু সেতুর ম্লান রেখা। এক জেলে খিলানের নিচে আশ্রয় নিয়ে বঁড়শি ধরে, কিন্তু মাছের আশা করে না। সে সেখানে কারণ সময় ঠিক, কারণ দীর্ঘ অভ্যাস তাকে অপেক্ষা সহ্য করতে শিখিয়েছে, পুরস্কার না এলেও।
আজকের নড়া চিহ্নিত করতে একজন পুরোনো চেয়ারে বসে এমন চিঠি লিখতে পারেন যা পাঠানোর জন্য নয়, মনকে রীতিতে বিশ্রাম দিতে। পাহাড়ের পথ হেঁটে পাথরে খোদাই নাম অনুসরণ করতে পারেন, আর নীরব নৈবেদ্য হিসেবে এক নুড়ি রেখে আসতে পারেন। সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক জামা ভাঁজ করে রাখা মনে করিয়ে দিতে পারে রূপের সম্মান রাখতে, অর্থ হারিয়ে গেলেও। বা বজ্র শুনুন, ঝলক আর গর্জনের মাঝের মুহূর্ত গুনুন, ধৈর্যে সময় মাপুন।
আজকের ভাগ্যের রং কালো।
Lucky Color: Black — #000000স্থিরতা টিকে থাকে। ছাঁচ ধরে থাকে।
নীরবতায় এক নতুন শৃঙ্খলা অপেক্ষা করে।