যে নীরব কক্ষে সম্রাট একসময় দরবার করতেন, সিংহাসন এখনো দাঁড়ানো কিন্তু আসনে হাত পড়েনি। পতাকা, মৌসুমের ধুলোয় মোটা, পাথরের দেয়ালে ঢিলে ঝোলে, শুধু জড়তায় রাখা শৃঙ্খলার অনুভূতি জাগায়। রাজদণ্ড, আখরোটের ভেতর থেকে কাটা, চেয়ারের হাতল জুড়ে পড়ে আছে, অনেক আগে ছাড়া আদেশের প্রতীক। এই প্রতিধ্বনি-ওঠা হলের বাইরে, যে মাটির বাঁধ একসময় দুর্গ রক্ষা করত তা নিজের মধ্যে বসে গেছে, চাপা মাটি হাজার পায়ের শক্ততায় কঠিন, যে পা আর যায় না।
এই আসন ঘিরে জগৎ সময়ের চাপে গড়া, যেখানে শুধু পদ্ধতি থাকে। ভাঙা দেয়ালের বাইরের ক্ষেতে মাটি লাঙল আর কড়া হাতের স্মৃতি ধরে রাখে। চাষ করা দোআঁশের সার দিগন্তের দিকে ছোটে, প্রতিটি নালা কর্তব্যে কাটা রেখা, ইচ্ছেতে নয়। কোনো শব্দ নেই, শুধু শরতের শেষ হাওয়ায় ঠেলে যাওয়া পড়া পাতার শুকনো চড়চড়, আর ক্ষুরের দূর বোল শুধু স্মৃতিতে প্রতিধ্বনি তোলে। সম্রাটের অনুপস্থিতি শুধু রীতি রেখে গেছে। মাটি ওল্টানো, বেড়ার যত্ন, উনুনের ধারে কাঠের স্তূপ। উদ্দেশ্য কাজের মধ্যে, ফলের মধ্যে নয়।
পুরাণে আর গল্পে খালি আসন রাজার হলে আর কাঠুরের কুঁড়েতে সমান প্রতিধ্বনি তোলে। পুরোনো গল্পে শৃঙ্খলা রাখা হয় কাঠবাদামের লাঠিতে, হাতিয়ার ততটাই যতটা ব্যাজ। একসময় শক্ত হাতে ধরা, এখন দরজায় হেলান, এমন এক রাজ্যের ওপর নজর যা নিজেই চলে। কাছের বন ছাল আর শেওলার গন্ধে ঘন। তাদের ছায়াতলে শিকারি যায়, গত রাতের বৃষ্টিতে জুতো দাগী। তারা যে প্রাণী খোঁজে তারা সতর্ক, পড়া সূঁচ আর পুরোনো গুঁড়ির খসখসে চামড়ার মধ্যে আশ্রয় নেয়। প্রাচীন কাফেলার পথে একসময় বণিক যেত, মশলার বোঁচকা আর শস্যের বস্তা টেনে, তাদের যাত্রা বোঝাই পশুর ধৈর্যশীল পায়ে চিহ্নিত। বছরের ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া জিন আর ফিতা এখন গুদামের খুঁটিতে ঝোলে, মনে করিয়ে দেয় বাণিজ্য পুরোনো ছাঁচ অনুসরণ করে, হাট শান্ত হয়ে গেলেও।
ইতিহাস ক্ষমতার ওঠানামা মনে রাখে সেই নীরব চিহ্নে যা পেছনে থাকে। দূর দেশে প্রাচীন রোদে-শুকানো মাটির দেয়াল সময়ের ভারে ধীরে গুঁড়ো হয়, ভেতর শূন্য হলেও আকার ধরে রাখে। পাহাড়ি গ্রামের কৃষক এখনো মাটি বাটি আর কলসিতে গড়ে, তাদের তালু শৃঙ্খলার এক শান্ত সাক্ষ্য চেপে দেয়। রান্নাঘরে এক কাঠের চামচ সেই একই ঝোল নাড়ে যা একসময় সৈনিক বা রাখালের জমায়েতকে খাওয়াত, রান্নার নিয়ম অপরিবর্তিত যদিও টেবিল এখন ফাঁকা। এই জিনিসে এক স্থিরতা আছে। হাতে বোনা আলখাল্লার খসখসে বুনন, তীরে তোলা মাছ ধরার নৌকোর শক্ত খোল, জানালার ধারে ঠান্ডা হওয়া রুটির শক্ত খোসা। সব সহ্য করে, সব টিকে থাকে, যে হাত তাদের গড়েছিল তা চলে গেলেও।
আবহাওয়া চেপে এলে আকাশ বৃষ্টির পর ওল্টানো মাটির চেহারা নেয়, ভারি আর কাছাকাছি, ক্ষেত আর বনের ওপর সমান চাপ দেয়। মেজাজ অপেক্ষার, পরের বোনার আগে ধৈর্য, পরের যাত্রার, পরের আদেশের যা কখনো না-ও আসতে পারে। আজ দৃঢ়তা পেতে একজন বাগানে হাঁটু গেড়ে হাতে মাটি ওল্টাতে পারেন, গত বছরের টুকরো কাঠে বেড়ার খুঁটি মেরামত করতে পারেন, বা ধীর চুল্লির উষ্ণতায় এক রুটি ফুলতে দিতে পারেন। পুরোনো কড়িকাঠ থেকে কাটা বেঞ্চিতে চুপ করে বসতে পারেন, দীর্ঘ হাঁটায় কুড়ানো মসৃণ পাথরের ভার অনুভব করে, মনে রেখে শৃঙ্খলা কখনো শুধু কাঠামোর স্মৃতিতে ধরা থাকে।
আজকের ভাগ্যের রং বাদামি।
Lucky Color: Brown — #A52A2Aস্মৃতি আর প্রক্রিয়া আপনার হাত স্থির রাখুক।
পেছনে ফেলে যাওয়া কাজে অর্থ আছে।