সিংহাসন রোদ-পড়া ঘরে অনড় দাঁড়ানো, উঁচু পিঠে পালকের ডানা আর সিংহের মাথা খোদাই, কিন্তু যার আদেশ দেওয়ার কথা তিনি অনুপস্থিত। শুধু শৃঙ্খলা থেকে যায়। মার্বেল টালির নিখুঁত নকশা, জানালার লোহার জালির রেখা, আরামকেদারায় পাতা শক্ত করা শণের কাপড়, এমন অতিথির অপেক্ষায় যে আসবে না। ক্ষমতা শুধু শৃঙ্খলায় নিজের ছাপ রেখে গেছে। রুমালের নিখুঁত ভাঁজ, দীর্ঘ পথে গোড়ালির শব্দ, রেশমের সুতোয় বাঁধা বার্ষিক কাগজ, তাকে নিখুঁত সারে রাখা। জায়গা কর্তৃত্বের স্মৃতি শ্বাস নেয়, তবু তার উপস্থিতির উষ্ণতা মলিন, জায়গায় কড়া নিয়ম থেকে যায়।
জানালার বাইরে শহরের ছাদ এমন আকাশের নিচে গলে যায় যেখানে সূক্ষ্ম কুয়াশা মৌসুম ঘোরার ইশারা দেয়। ঝড়বৃষ্টির পরের সকালে চিমনি নিজের ইশারায় জেগে ওঠে। সেই সূক্ষ্ম ধোঁয়া যা ওঠে যখন রুটিওয়ালি প্রথম চুল্লি জ্বালায়, যখন কামার কামারশালার আগুন ধরায়, যখন এক দিদিমা ঘরের পেছনে তামার হাঁড়িতে কাপড় নাড়ে। চকে পায়রা গির্জার সিঁড়িতে ফেলে রাখা গুঁড়ো ঠোকরায়, আর ভোরের মানুষ রুটির অপেক্ষায় দাঁড়ালে মুখ থেকে নরম ভাপ বেরোয়। একসময় পুরোনো জগতের অনুষ্ঠানে পতাকা খুলত শাসকের অভিষেক চিহ্নিত করতে, আর সব চোখ সেই নরম মেঘের জন্য তাকাত যা এক নিভৃত সভা রায়ে পৌঁছালে বেরোত, প্রমাণ যে কিছু পবিত্র পার হয়ে গেছে।
শহরের বাইরের পাহাড়ে রাখালরা ভোরের আগে জড়ো হয়, উষ্ণতার জন্য হাত ঘষে আর দেখে তাদের নিশ্বাস নদীর ওপর কুণ্ডলী-পাকানো কুয়াশার সঙ্গে মেশে। ভেড়া ছোট দলে চরে, শীতের ঝড়ে লোম মোটা আর জট পাকানো। খোলা আগুনের ওপর কেটলি শিস দেয়, তার নল পাতলা কাপড়ে জড়ানো যাতে জল থেকে প্রতিটি অপদ্রব্য ছেঁকে। দৈনন্দিন জীবনের রীতি এই ছোট অনুষ্ঠানে রক্ষিত। মলমলে ছানা চেপে রাখা, তাজা রুটির ফালিতে নরম পনির মাখা, রবিবারের জন্য আলাদা রাখা সুতির বর্গক্ষেত্রে মুখ ধোওয়া। প্রতিটি ইশারা নিখুঁত, যেন আদেশের মূর্তি মিলিয়ে গেলে শৃঙ্খলা নিজেই জগৎকে ধরে রাখতে পারে।
ঘরের ভেতরে শৃঙ্খলার ছাপ থেকে যায় খাবারের আগে টেবিলের কাপড় যত্ন করে পাতায় আর সন্ধ্যায় পর্দা ভাঁজে। ভাপ ওঠা ভাতের বাটি বা সদ্য সেদ্ধ ডিম থেকে এক হালকা গন্ধ ওঠে। বড়রা দূর দেশের গল্প বলে যেখানে ধীর মেঘ সমুদ্র থেকে গড়িয়ে বন্দরশহরে বসত, নোঙর করা জাহাজ লুকিয়ে রাস্তা অচেনা করে দিত। কোণের দোকানের পুরোনো বণিক সেই দিন মনে করে যখন নতুন মাল পাতলা কাগজে মোড়া আসত, প্রতিটি স্তর খুলে ধন বেরোত। চিনামাটি, সূচির কাজ, মশলা, নরম লেগে থাকা আঁশে পাহারা দেওয়া। এখন শুধু খোলার কাজ থাকে, অনুষ্ঠানের প্রতিধ্বনি।
আবহাওয়ায় পূর্বাভাস সেই দিনের খবর আনে যখন কুয়াশা চুপচাপ নামে, ক্ষেত আর বেড়া ঢেকে, আর প্রতিটি রেখা নরম হয়। শিশুরা জানালায় হাত চেপে দেখে জগৎ বৈশিষ্ট্যহীন আর দূর হয়ে যায়। এটা সবচেয়ে জোরে ঝড়ের পরের নীরবতা, শহর জাগার আগের শান্ত, ওলটপালটের পর যে নরম পর্দা বসে, ধৈর্য আর যত্নে আবার শুরু করার সুযোগ ছাড়া কিছু প্রতিশ্রুতি দেয় না। তেমনি ক্ষমতার আসন খালি বসে, কিন্তু তার পদ্ধতি চলে, এক ইচ্ছায় নয়, মনোযোগের সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে স্থায়ী কাজে।
আজ আপনি ভোরে শণের কাপড় হাওয়া খাওয়াতে পারেন, তোয়ালে উত্তরাধিকারের মতো ভাঁজ করতে পারেন, বা এক রুটি পরিষ্কার মলমলে মুড়ে অন্যদের সঙ্গে ভাঙার আগে রাখতে পারেন। চিমনির ওপরের ভাস ভাস দেখতে থামতে পারেন, বা সকালে কেটলির সবচেয়ে নরম শিস শুনতে পারেন।
আজকের ভাগ্যের রং ধোঁয়া সাদা।
Lucky Color: WhiteSmoke — #F5F5F5নতুন দিনের শৃঙ্খলা শান্ত হাতে থাকে।
নীরবতা পুরোনো রূপকে সামনে বয়ে নেয়।