বাগান এখন শান্ত। গত বছরের আগাছায় তার পথ ছাপিয়ে গেছে। দরজা কব্জায় হেলে, পাথরের ধাপ পড়া পাতায় ঢাকা। একসময় সম্রাজ্ঞী শিম আর লতার এই সারি দেখতেন। হাত গ্রীষ্মের শেষের শুঁটির ঝুড়িতে ভরা, যত্নশীল হাতে চেরা পাকা শুঁটি। তুঁত গাছে পাখি গাইত, বাতাসে উষ্ণ মাটির গন্ধ। এখন সম্রাজ্ঞী মুখ ফেরানোয় জমি বুনো হয়। ফল টেবিলে তার জায়গা খুঁজে পায় না।
এই বাগানের হৃদয়ে এক শক্ত গাছ একসময় ছায়া দিত, তার শুঁটি ভারী ঝুলত। দূর দেশে এই গাছ ঝোপের উপরে ওঠে। চওড়া পাতা কড়া রোদ থেকে মাটি আগলায়। শুঁটি, খসখসে আর শিরা-আঁকা, শক্ত খোলের ভিতরে এমন এক ধন লুকায় যা পথিক, বণিক, আর কবি সবাই খোঁজে। বর্ষার আবহাওয়ায় শিকড় গভীর পান করে। খালি পায়ে কাদা লেগে, কাজের মানুষ ফসল জড়ো করে। এখান থেকে দূরে, নদী আর জঙ্গলের মাঝে চাপা গ্রামে, এই শুঁটি চেরা হয়, অনিশ্চিত আকাশের নিচে শুকোতে মাদুরে পাতা হয়।
অনেক আগে এই বীজ স্রোত আর জাহাজে পথ করত। দূর হাটের উদ্দেশে বাক্সে ভরে বাঁধা। নাবিক আর বণিকের হাত পেরিয়ে এমন রান্নাঘরে পৌঁছত যেখানে মাটির কাপে মশলাদার পানীয় বাষ্প ছাড়ত। অভিজাত দরবারে ঝলসানো বীজের গন্ধ টালির হলঘর পেরিয়ে যেত, হামানদিস্তায় নোড়ার শব্দের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে বীজ চাপা হত, মেশানো হত, কাঠের ছাঁচে ঢালা হত, ক্ষিপ্র আঙুলে কাগজে জড়ানো হত। উৎসবে বদল করা চিহ্ন হয়ে উঠত। শালে ভাঁজ করা ছোট বিলাস, অথবা লেখার টেবিলের টানায় সরিয়ে রাখা।
বাগানের নীরব অবহেলায় দেখাশোনার অনুপস্থিতি অনুভব করা যায়। ঝুড়ি খালি, মাটি না-ওল্টানো। হাতিয়ার, কোদাল, ছুরি, আর খুরপি, ধুলোর পাতলা আস্তরণের নিচে বিশ্রাম নেয়। বাগানের আশ্রয়ের ভারী সান্ত্বনা এখন চেপে ধরে। মনে করিয়ে দেয়, প্রাচুর্য ফুসলাতে হয়, দান নিজে জড়ো হয় না। না-তোলা ফসল সরে যায়। শুঁটি স্যাঁতসেঁতেতে পচে, বীজ পিঁপড়ে বয়ে নিয়ে যায়, ঋতুর স্পন্দন ম্লান হয়।
তবু এই একই বীজ থেকে এক শিক্ষা আছে। ফসল হারালেও, রান্নাঘর নীরব থাকলেও, উষ্ণতার স্মৃতি থাকে। শুকনো, তিক্ত এক টুকরো ফল পিষে মিষ্টি করা যায়। ধৈর্যশীল হাতে ক্লান্ত মনের সান্ত্বনায় বদলানো যায়। রান্নাঘরের এই বদল একসময় জীবন্ত মাটি থেকে ফুসলানো বদলের প্রতিধ্বনি। প্রাচীন দরবারে পানীয় ধরা পাত্র, আর ঘরের ভাঁড়ারে পাতলা ধাতুর মোড়কে জড়ানো দণ্ড, সব এই অবহেলা করা শুঁটি পর্যন্ত তাদের বংশের রেখা টানে।
আজ আপনি ভুলে যাওয়া বাগানে পা দিতে পারেন, পড়া যেকোনো শুঁটি জড়ো করতে পারেন, স্মৃতিতে হলেও। মশলাদার পানীয়ের কাপের চারপাশে হাত উষ্ণ করতে পারেন, যে গন্ধ ওঠে তা লক্ষ করে। দূরে থাকা কাউকে এক চিঠি লিখুন, শান্তির ইশারায় এক ছোট গ্রাস ভিতরে রাখুন। রান্নাঘরের হাতিয়ার থেকে ধুলো ঝাড়ুন, আরেক মরশুমের জন্য তৈরি রেখে দিন।
আজকের ভাগ্যের রং চকলেট।
Lucky Color: Chocolate — #D2691Eমাটির দান আপনার হাত খুঁজে পাক, শান্ত মরশুমেও।