লণ্ঠন উপত্যকার অনেক ওপরে পাল্লা বন্ধ, তার রক্ষক ভারী পশমে জড়ানো, ঘণ্টা পেরোলেও স্থির বসে। পাহাড় আর পায়ের ডাক দেয় না, আর নিচের তৃণভূমি খালি, শুধু দীর্ঘ অভ্যাসে মাটিতে চাপা এক পথ। একসময় এমন মূর্তি পথ দেখাতেন। রাস্তা আলো করতেন, প্রশ্নের অপেক্ষায় থাকতেন, বিনয়ী শিখায় পথ দাগাতেন। এখন বাতি ঠান্ডা, আর সন্ন্যাসী ফিরতে না চাওয়া বেছে নিয়েছেন, একাকিত্বকে বিশ্রামের জায়গা থেকে স্থায়ী ঠিকানায় বদলে। সঙ্গ অস্বীকার এক সীমানা হয়ে যায়। এ ফেরার আগের বিরতি আর নয়, নিজেই এক দিক। এখানে ওপরে ঘর নীরব। কাপ টেবিলে অপেক্ষা করে, না-ছোঁয়া।
ঢালের বাইরে পৃথিবী চলতে থাকে। বন্দরের শহরে জোয়ার সবে ঘুরেছে। পুরোনো নাবিকেরা, যাদের চোখ দিগন্ত মিলিয়ে যেতে আর ফিরে আসতে দেখেছে, দড়িতে গিঁট বাঁধেন, তাদের হাত সমুদ্রে বছর শেখা যত্নশীল নকশায় নড়ে। জেলেরা পাতলা মোমবাতির আলোয় জাল সারায়, তাদের নৌকা পাথরের ঘাটের গায়ে শান্ত দোলে। জলভাঙা বাঁধ থেকে এক একা জাহাজ খোলা জলের দিকে যেতে দেখা যেতে পারে, পাল শক্ত টানা, জাহাজের পাটাতন শিশিরে চকচকে। মাথার আকাশ এত গভীর যে শহরকে পুরো গিলে নেয় বলে মনে হয়। ছাদের ওপরে এক বিস্তৃত বিস্তার লম্বা হয়, অবিভক্ত আর দাগহীন, তার গোপন কথা কাছে ধরে। এ সেই ঘণ্টা যখন ঘণ্টা নীরব আর প্রতিটি জানালা অবিরাম অন্ধকারের বিরুদ্ধে পাল্লা বন্ধ।
সন্ন্যাসী, উপত্যকার দিকে পিঠ ফিরিয়ে, চাপা রাত শোনেন। বাতাস ভারী, পুরোনো গল্পের স্মৃতি বয়ে। আরেক শতকে এক পণ্ডিত লেখার টেবিলে বসে থাকতে পারতেন, কলম সরিয়ে, কালির ডোবায় তাকিয়ে যা কিছু ফেরাত না। তিনি ভারী মখমলের পর্দার দিকে ঘুরতে পারতেন, জানালায় টানা, চাঁদের সবচেয়ে ছোট টুকরোও আটকে। রান্নাঘরে এক হাঁড়ি ফোটে, ভুলে যাওয়া। এক রুটি ঠান্ডা হয়, খোসা অভাঙা। স্থিরতা পুরো, শুধু ঘড়ির টিকটিক ভাঙে, মনে করায় সঙ্গ প্রত্যাশিত বা অনুমোদিত না হলে সময়ও ধীর হয়।
এমন এক আবহাওয়া আছে যা এই ঘণ্টার। কিছু রাতে দিগন্তের কিনারায় ঝড় জমে কিন্তু তার শান্তি ধরে রাখে। হাওয়া ভেজা মাটি আর দূরের সরল গাছের গন্ধ বয় কিন্তু ডাল নাড়ে না। শহরের রাস্তা আগের বৃষ্টির অবশেষে জ্বলে, কিন্তু এখন কেউ হাঁটে না। জলের ডোবা ওপরের অভাঙা আকাশ প্রতিফলিত করে, পা বা চাকায় অবিচলিত। কখনো এক দূরের রেলগাড়ি অন্ধকার পেরিয়ে যায়, জানালা পাল্লা বন্ধ, তার শিস ঘন বাতাসে চাপা। সবকিছু ধরে থাকে, ঝুলে, এমন সংকেতের অপেক্ষায় যা আসবে না।
আপনি যদি এই স্রোতের সঙ্গে চলতে চান, ঘরের শেষ আলো নেভান আর জানালার কাছে দাঁড়ান, বাইরে আপনার চারপাশে বসতে দিন। মুঠোফোন সরিয়ে রাখুন আর না-পড়া চিঠি টানা বাক্সে স্তূপ করুন, আপনার টেবিলকে না-ব্যবহৃত পড়ার ঘরের নিস্তব্ধতা দিন। সুতোর এক টুকরো শক্ত আঁটিতে পাকিয়ে গুঁজে রাখুন, দীর্ঘ রাতের জন্য শৃঙ্খলার এক ছোট কাজ। চায়ের জন্য জল ফোটান কিন্তু ঠান্ডা হতে দিন, উষ্ণতা নয়, স্মৃতির গন্ধে ঘর ভরুন।
আজকের ভাগ্যের রং মধ্যরাতের নীল।
Lucky Color: MidnightBlue — #191970পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় থাকা কখনো তার সীমা জানা।