দুটি নীরব স্তম্ভের মাঝে মহাযাজিকা থাকেন। তাঁর উপস্থিতি দেখা আর লুকোনোর সীমানা দাগায়। তাঁর পেছনের পর্দা শক্ত করে টানা, যেন নাগালের ঠিক বাইরে থাকা রহস্যকে আগলায়। কোলে এক পুঁথি বন্ধ থাকে, লেখা ঢাকা। নিচে জল নিথর। শুধু তাঁদেরই প্রতিবিম্ব ফেরায়, যাঁরা শান্ত হৃদয় আর খালি হাত নিয়ে কাছে আসতে সাহস করেন। তাঁর আঙিনার স্থিরতা শূন্যতা নয়। গোপন কথায় ভরা, প্রকাশের আগের নিস্তব্ধতা। এখানে শুকনো পাতার সূক্ষ্ম গন্ধ আর দূরে জল গড়ানোর শব্দ পৃথিবীকে থমকে রাখে, অপেক্ষায় ভেজানো।
কালি কাগজে ছোঁয়ার অনেক আগে গোপন কথা রাখার অন্য পথ ছিল। সবুজ নদী-উপত্যকায় আর ধাপ-ক্ষেতে মানুষ মোমের মতো পাতার গাছ তুলতে ঝুঁকত। তাড়াহুড়ো করা চোখ প্রায়ই সেই পাতা এড়িয়ে যায়। পাতা থেতলে ভিজালে এক অদ্ভুত গন্ধ ছাড়ে, মাটির আর তীক্ষ্ণ। চাষি আর রংকরেরা ধৈর্যে দক্ষ। বড় চাড়িতে প্রস্তুতি ধীর আর যত্নশীল রাখতেন। বদলটা চুপ করে দেখতেন, জানতেন জাদু চোখের আড়ালে খোলে, জলের তলার নিচে। প্রক্রিয়া পর্দায় ঢাকা ছিল। পরিবারের পর পরিবার প্রণালী, রীতি, আর সময় হাতে হাতে দিয়ে আগলে রেখেছে। যা বেরিয়ে আসত, লম্বা লম্বা কাপড়ের ফালি। কাছে দূরে দামি। বাঁকা বাণিজ্যপথের বণিকদের ঈর্ষা, সেই গভীরতা।
এই তৈরি কাপড় মন্দির আর রাজদরবারে পৌঁছত। পুরোহিতেরা যখন গুহ্যবাণীর সঙ্গে পরামর্শ করতে পর্দার আড়ালে যেতেন, তাঁদের পোশাক কাটা হত দূরের ফসলের রসে ভেজানো কাপড় থেকে। এক কোমরবন্ধ বা এক চাদর বলতে পারত পাহাড় আর মরু পেরোনোর কথা, অথবা বৃষ্টির বিকেল, চাড়ি থেকে কাপড় তোলার ঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা। শান্ত ঘরে এই কাপড়ের এক টুকরো দামি বইয়ের চারপাশে জড়ানো থাকতে পারে, অথবা ধ্যানের ছাউনি হতে পারে। প্রতিদিনের মনে করিয়ে দেওয়া, পৃথিবীর শব্দের ওপারে কী আছে।
অন্যদিকে, সমুদ্রের ধারের ব্যস্ত হাটে দূর বন্দরের বণিকেরা শক্ত, ভারী বাঁধা আঁটি নামাতেন। নোনা বাতাস মেশে সংরক্ষিত গাছের গন্ধের সঙ্গে, স্মৃতির মতো তীক্ষ্ণ। বৈদ্যরা কখনো শুকনো শুঁটি পিষতেন, গুঁড়ো জলে মিশিয়ে দরজায় আশীর্বাদ আঁকতেন, অথবা অনুষ্ঠানের ভাত রাঙাতেন। উৎসবের দিন সেই নির্যাস জলের বাটিতে ছড়ানো হত, গন্ধ সকালের কুয়াশার সঙ্গে উঠত। কোনো কোনো দেশে গ্রামের নাম, নদীর বাঁক, আর ঘরের খতিয়ানের পাতা বছরের ফসলের দাম লিখে রাখত। আর সেই দীর্ঘ মাস, চাড়ি তার গোপন ধন দেওয়ার আগে ধৈর্যের অপেক্ষা।
আকাশও মহাযাজিকার গোপন কথার কথা মনে করিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের ঝড়ের আগের মুহূর্ত, মেঘ জমে, হাওয়া ঠান্ডা হয়, অপেক্ষার ভারে ভারী লাগে। এমন দিনে পৃথিবী যেন শ্বাস আটকে রাখে। পর্দার ওপর থেকে এক ইশারার অপেক্ষায়। ইশারা যে, যা লুকানো তা খুলবে, কিন্তু শুধু তখন, যখন সময় আর নীরবতাকে সম্মান করা হয়।
আজ আপনি এক কেতলিতে চা বসাতে পারেন, একসময় রং করতে লাগা শুকনো পাপড়ি দিয়ে। বাষ্প সকালে আলতো কুণ্ডলী হোক। কাঁধে এক ঘন বোনা ওড়না রাখতে পারেন, আঙুল দিয়ে দূরের পাহাড় আর নদীর নকশা ছুঁতে পারেন। দামি বইয়ের পাতায় এক ফুল চেপে রাখা, অথবা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা শোনার জন্য থামা, আপনাকে না-বলা জিনিসের কাছে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয়, কিছু কথা আপাতত গোপন রাখার মধ্যেও সৌন্দর্য আছে।
আজকের ভাগ্যের রং নীল।
Lucky Color: Indigo — #4B0082গোপন কথা ধরে থাকে। উত্তর তার সময়ে অপেক্ষা করে।
ধৈর্য আর নীরবতা আপনার পথ দেখাক।