চৌকাঠে দুটি স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে, নড়ে না। নীরব পথকে ঘিরে চোখকে ছায়ার দিকে টানে। তাদের মাঝে এক পর্দা ঝোলে, মোটা আর সূচির কাজ করা, বাগানের গোপন কথা আটকে রাখে। কোলে মহাযাজিকা এক বন্ধ পুঁথি জড়িয়ে ধরেন। তার লেখা অযোগ্য চোখের থেকে লুকানো। তাঁর পায়ের কাছে জল জমে আছে, এত স্থির যে আকাশ আর পাথরের সবচেয়ে ফিকে আকারই ফেরায়। ভবিষ্যৎও নয়, অতীতও নয়, শুধু এই মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তিনি রক্ষক, আবার সাক্ষী। যে জ্ঞান এখনো কথার জন্য নয়, তা তিনি আগলে রাখেন।
খোলা সমুদ্রের ধারে এমন রাত আসে, যখন আকাশ নিচু হয়ে চেপে ধরে। মখমলের মতো বিস্তার শেষ ছাড়া ছড়িয়ে থাকে। দূরে বাতিঘরের আলো, অথবা অজানা তীরের দিকে গুটিয়ে যাওয়া নীরব পাল, শুধু তাতেই সেই বিস্তার ভাঙে। লুকানো খাঁড়ি থেকে দেরিতে ফেরা জেলেরা এই ঘণ্টার ছোঁয়া চেনেন। বাতাস ঘন, হাওয়ার পরের নিস্তব্ধতা, আর ঢেউ আবার নড়ার আগের বিশ্রামে পৃথিবী। ইতিহাস বলে, এমন আবহাওয়ায় নাবিকেরা চুপ করে গিঁঠ গুনতেন। তারা বা দিকযন্ত্র নয়, স্মৃতি আর অন্তর্জ্ঞান দিয়ে পথ চিনতেন।
গভীর রাতে প্রাচীন গ্রন্থাগারের ভিক্ষুরা তিমির তেলের বাতির কাঁপুনিতে পুঁথি খোলেন। তাঁদের ভারী, সাদামাটা পোশাক রাতের গোপন কথা শুষে নেয়। তালা-আঁটা সিন্দুক আর পাণ্ডুলিপির সারি ধরা পাথরের দীর্ঘ পথ দিয়ে নিঃশব্দে চলেন। পাতা ওল্টানোর ধীর নিস্তব্ধতা হলঘরে প্রতিধ্বনি তোলে, ধৈর্য আর সম্মানের এক রীতি। সময়ের সঙ্গে পাতা বৃষ্টি আর কালির গন্ধ শুষে নেয়। রাখা, কখনো বলা হয়নি, এমন গোপন কথার স্মৃতি।
লেখক আর পণ্ডিতেরা সবসময় এমন নীরবতায় সান্ত্বনা খুঁজেছেন। ভার্জিনিয়া উলফ ভোরের আগে উঠতেন। শহর যখন ঘুমোত, কলম কাগজে চাপতেন। তাঁর টেবিল জানালার দিকে, যেখানে আকাশ কাচের ওপর নিচু হয়ে চেপে থাকত, যা লুকিয়ে রেখেছে তার ভারে ভারী। সেই একই ঘণ্টায় এক ঘড়িমিস্ত্রি নিজের বেঞ্চের ওপর ঝুঁকেন। বাইরের জগৎ ছায়ায় মিলিয়ে যায়। একমাত্র শব্দ, হাতের যন্ত্রের টিকটিক। সেই নিস্তব্ধতায় পৃথিবী তার সত্য ধীরে ধীরে দেয়।
উত্তরের বনের কিনারায় নীল তোলার মানুষেরা সাবধানে পা ফেলেন। তাঁদের ঝুড়িতে গোপন রাখার জন্য বোনা কাপড়ের আস্তর। চাঁদ ক্ষয়ে আসার সময় তোলা পাতা, তার সময় না আসা পর্যন্ত আলো থেকে দূরে রাখতে হয়। কাছেই হাসনাহেনা ফোটে, বেশির ভাগ চোখের অদৃশ্য। তার গন্ধ ভেসে আসে। ইশারা যে, কিছু জিনিস তখনই নিজেকে খোলে, যখন পৃথিবী সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে মনোযোগী।
পড়ার ঘরের এক টানা পর্দা তার ভাঁজে চাপা গল্প ধরে রাখতে পারে। দশকের পর দশক ফিসফিস করা ভরসা, আর বাতির আলোয় পড়া। সবসময় শব্দ আটকে রাখে, নীরবতাকে বসতে দেয়। ওষুধের তাকের ভারী কাচের বোতলও, সিল করা, যত্ন করে হাতে লেখা নাম, যে মুহূর্তে লাগবে সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে। ভিতরের জিনিস গোপনে আগলে রাখা। পুরনো শহরে মিনার নীরব বন্দরের ওপর পাহারা দেয়। গম্বুজ আর চূড়া ভোরের কুয়াশায় জড়ানো। ঘণ্টা বাজে না। ঘণ্টা গুনে রাখা হয়।
আজ আপনি ভোরের আগে উঠে পৃথিবীর নিস্তব্ধতা শুনতে পারেন। অথবা জানালায় এক মোটা, সূচির কাজ করা পর্দা টেনে চুপ করে বসতে পারেন, নীরবতা গভীরে বসুক। এক খুব পড়া বই নামিয়ে শুধু এক পাতা পড়তে পারেন, যত্ন করে বন্ধ করতে পারেন। অথবা এক চিঠি সিল করে, আগামী কোনো সময়ের জন্য নিরাপদে সরিয়ে রাখতে পারেন। প্রতিটি কাজ ধৈর্যের দিকে এক ইশারা, আর গোপন কথা রাখার শক্তি। জানা আর না-জানার চৌকাঠকে সম্মান করা।
আজকের ভাগ্যের রং মধ্যরাতের নীল।
Lucky Color: MidnightBlue — #191970নীরব ঘণ্টার রং, আর অপেক্ষা থেকে যে বুদ্ধি আসে।
নিস্তব্ধতায় সব গোপন কথা অক্ষত থাকে।