মহাযাজিকার শান্ত আশ্রয়ে দুটি স্তম্ভ দূরে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মাঝের নিস্তব্ধতা ধরে রাখে। এক পর্দা ঝোলে, সুতো শক্ত করে বোনা, যা দেখা যায় তা আর যা শুধু অনুভব করা যায় তা আলাদা করে। কোলে বন্ধ পুঁথি নীরব। গোপন লেখা ঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায়। পায়ের কাছে স্থির জল উপরের চাঁদকে ফেরায়। তলার নিচে যা আছে, তার আয়না। এই কার্ড হলো না-জানার ভিতরে লুকানো জানার প্রতিশ্রুতি। পর্দার আড়ালের ঘরে বন্ধ বুদ্ধি।
ইতিহাসেরও পর্দা আছে। আনাতোলিয়ার নদীর তীরে বণিকেরা একসময় দণ্ড আর মুদ্রা বয়ে নিয়ে যেতেন, অর্ধচন্দ্রের দেবী আর্তেমিসের চিহ্ন আঁকা। এগুলো সাদামাটা চিহ্ন ছিল না। ভরসা আর রক্ষার নিশানা। যে নীরব ঝিকমিক লুকানো যায় না, তার জন্য দামি। পরে, মধ্যযুগের মঠের উঁচু খিলানে ভিক্ষুরা সবচেয়ে দামি পাণ্ডুলিপি সিন্দুকে রাখতেন। তালা আর কব্জা লাগানো, শহরের যত্নশীল কামারের হাতে বানানো, যাঁরা মোমবাতির আলোয় রাত পর্যন্ত কাজ করতেন। এমন সিন্দুক গ্রন্থাগারের হৃদয়ে দাঁড়াত। ওষুধি গাছ আর ভুলে যাওয়া প্রার্থনার কথা ফিসফিস করা পাঠ ধরে রাখত। বাঁধা, আগলে রাখা গোপন কথা, ধৈর্যশীল পাঠকের অপেক্ষায়।
ভূগোল নিজের নিস্তব্ধতা ধার দেয়। শীতের ঝড়ের পর বিরল সকালে জমি হিমের চাদরের নিচে ঘুমোয়। প্রতিটি ডাল আর ছাদ ঠান্ডা, পরিষ্কার জরির রেখায় আঁকা। ভোরের পথিক জানেন পায়ের নিচে পথের কড়কড়, আর নিঃশ্বাস কুয়াশা হয়ে মিলিয়ে যায়। কখনো আকাশ নিজেই নেমে আসে, ক্ষেতে কুয়াশা বসে, সব শব্দ চাপা দেয়, শুধু দূরের এক পাখির ডাক বাদ যায়। সুদূর উত্তরে নদীতে মাছ চলে, আঁশ ঝিকিমিকি করে পাথরের ফাঁকে। একই মুহূর্তে খোলে আর লুকায়। প্রাচীন আন্দিজে পিটিয়ে বানানো মুদ্রার এক সারি একসময় পথিকের পথ দাগাত। উঁচু গিরিপথ পেরিয়ে নীরবে পথ দেখাত।
ঘরের ভিতরে স্মৃতি থেকে যায় হাত থেকে হাতে যাওয়া জিনিসে। রান্নাঘরের টানায় সরু চামচ, একসময় নামকরণের উপহার। বিছানার নিচে তালা-আঁটা বাক্স, যেখানে দিদিমা চিঠি ফিতেয় বেঁধে রাখতেন। মোমবাতির এক জোড়া দণ্ড, ভাবনার রাত বা প্রার্থনার রাতে বের করা হয়। এগুলো নীরব অতিথি। প্রজন্মের মাঝে ধারাবাহিকতা দেয়। ঠান্ডা সন্ধ্যায় টেবিলে আনা চায়ের কেতলি বাতির আলোয় চকচক করে। বাষ্প উপরে কুণ্ডলী হয়, কথা বলার আগের সেই নিস্তব্ধতা। পুরনো টেবিলের লুকানো টানায় এক আংটা, এক মুদ্রা, বা ভাঁজ করা এক চিরকুট থাকতে পারে। তার গল্প ঠিক খোঁজার মানুষের অপেক্ষায়।
আগুনের পাশে বলা গল্পে মহাযাজিকা আলতো পায়ে আসেন। হাতে পারদের এক বাটি, আয়নার মতো আর ধরাছোঁয়ার বাইরে, স্বপ্নদেখাকে ঘুমের কিনারায় নিয়ে যান। অথবা ভোরে তীরে হাঁটেন, সরে যাওয়া জোয়ারের ফেলে যাওয়া আকরিকের এক সুতো খুঁজে। তাঁর পা বালিতে নকশা চাপে। তিনি জানেন ধৈর্যের দাম, পরামর্শ চেপে রাখার দাম, উত্তরকে পর্দার আড়ালে রাখার দাম, মুহূর্ত পাকা না হওয়া পর্যন্ত।
আজ আপনি নিজের দৈনন্দিন চারপাশে লুকানো কিছু খুঁজে পেতে পারেন। টানার পেছনে ভুলে যাওয়া এক স্মারক, অথবা বোয়ামের তলায় এক পুরনো মুদ্রা। পরিবারের মোমবাতির দণ্ড পরিষ্কার করতে থামতে পারেন, অথবা হাতের লেখা চিঠির ওপর আঙুল বোলাতে পারেন। পুরনো কেতলিতে চা বসান, শান্ত সকালে বাষ্প উঠুক। অথবা ভোরে বাইরে পা দিন, মাটিতে বসা নীরবতা শুনুন। তলার নিচে রাখা এক প্রতিশ্রুতি।
আজকের ভাগ্যের রং রুপালি।
Lucky Color: Silver — #C0C0C0গোপন কথা পর্দার আড়ালে অপেক্ষা করে, ধৈর্যশীল আর উজ্জ্বল।
যা বলা হয় না, তা শুনুন।