দুটি স্তম্ভের মাঝে মহাযাজিকা দাঁড়িয়ে আছেন, নীরব আর স্থির। তাঁর পুঁথি কোলের ওপর ভাঁজ হয়ে থাকে, লিপি ভিতরের দিকে, জগৎ থেকে সরিয়ে রাখা। তাঁর পেছনে এক পর্দা কপাট থেকে মেঝে পর্যন্ত ঝোলে, ডালিমের দানার নকশায় সেলাই, ওপারের জায়গা বন্ধ করে। জলের তল তাঁর পায়ের কাছে চুপ করে জমে, অটুট আর স্বচ্ছ। আকাশকে নয়, তাঁকে ঘিরে থাকা স্তম্ভ আর কাপড়ের গুচ্ছকে ফেরায়। এই ঘরের বাতাস ঠান্ডা। নিস্তব্ধতা পূর্ণ, শুধু দূরের এক বারান্দায় ফিকে হাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।
তিনি যে গোপন কথা রাখেন, তা বলা হয় না। তা বাস করে পাথরে আর কাগজে, স্থির জলের ভারে, আর পুরনো স্লেটের ছাদের স্মৃতিতে, যা মঠ আর গ্রন্থাগারকে আশ্রয় দেয়। এই ছাদ শত শত বছর ধরে হাতে চেরা, হাতে বসানো। অন্তহীন বৃষ্টি আর কুয়াশায় টিকে থাকে। ভোরের নিস্তব্ধতায় তাদের তল পিছল। উপত্যকায় খাদানের মজুরেরা একসময় তাজা ফলক চিরতেন। হাতুড়ি স্তরীভূত মাটিতে বাজত। প্রতিটি টুকরো তোলা হত গির্জার মুকুট হতে, পবিত্র আর সাংসারিক জমির সীমানা দাগাতে। ছাদের টালি দশকের ঝড় আর মৃদু গুঁড়ি বৃষ্টিতে পেকেছে। কখনো শুধু পাথরের রং নয়। তাদের চকচক ঝড়ের পর প্রথম আলো ধরে, আর সন্ধ্যার আগের শেষ আভা।
রান্নাঘরে নীরব ঘণ্টা আরেক প্রতিধ্বনি বের করে। পুরনো রুটির তক্তা, সেই একই পাথর থেকে কাটা, ছুঁতে ঠান্ডা, বছরের ব্যবহারে কিনারা খোদাই। আলুবোখারা আর ডুমুরের নরম ভার ধরে। বাইরের জগৎ নীরব থাকতে রুটি কাটা হয়, গুঁড়ো আলতো পাথরে পড়ে। পাহাড়ি স্লেট থেকে ঘোরানো এক হামানদিস্তা সকালের জাউয়ের বীজ পিষে। প্রতিটি ঘোরানো এক ধৈর্য, মহাযাজিকার দৃষ্টির সঙ্গে মেলে। রুটিকে ফুলতে দেওয়া, ফলকে ভিজতে দেওয়া, এই কাজের ধৈর্য সেই ধৈর্যের আয়না, যা লাগে এক গোপন কথা নিজে খুলুক তার অপেক্ষায়।
দূরে, এক নদী-উপত্যকায় যেখানে বাতাস সবসময় স্যাঁতসেঁতে, আবহাওয়া লম্বা নিচু মেঘে আসে। জমিকে এত ভালোভাবে পর্দা করে, যেমন মহাযাজিকার পেছনের পর্দা। কুয়াশা পাহাড়ে বসে, জগৎকে ছোট আর শান্ত করে। শিশির বুনো হায়াসিন্থ আর নীল ঘণ্টাফুলের পাপড়িতে জমে। তাদের আকার মাটির ঠিক উপরে কাঁপে, লুকানো, শুধু যাঁরা জানেন কোথায় তাকাতে হবে তাঁদের চোখে। উপত্যকার নিস্তব্ধতা সেই নিস্তব্ধতা, যা মন্দির ভরায়। প্রকাশের আগের ঘণ্টায় আটকে রাখা এক শ্বাস।
সব গোপন কথা শুধু বড় মন্দির বা দূরের ভূদৃশ্যের নয়। স্লেটের তাকের সারি দেওয়া এক পড়ার ঘরে চিঠি লুকানো বাক্সে রাখা থাকে, যত্নশীল হাতে লেখা। তাক সময় আর ছোঁয়ায় মসৃণ। বাক্স সন্তোষের ভারে বন্ধ হয়। এক কলম মোটা কাগজের পাশে বিশ্রাম নেয়, এমন এক ভাবনার অপেক্ষায় যা এখনো আকার নেয়নি। এখানকার নীরবতা পূর্ণ। একমাত্র নড়া, পাথরের তলে আলোর ফিকে সরে যাওয়া।
আজ আপনি নাশতার আগে রান্নাঘরের স্লেট ঝাঁট দিতে পারেন, প্রতিটি নড়া স্থির আর ভাবনাময় হোক। পুরনো পাথরের জানালার ধারে আর এক মুহূর্ত বসতে পারেন, প্রথম আলো তার তলে কেমন ছোঁয় তা দেখে। খাতায় এক গোপন আশা লিখতে পারেন, মলাট ইচ্ছাকৃত যত্নে বন্ধ করে। অথবা ভোরের নিস্তব্ধতায় থেমে শুনতে পারেন, নীরবতার নিচে কী নড়ে। এই ছোট কাজ মহাযাজিকার স্থিরতা আর ধৈর্যকে দৈনন্দিন জীবনে বাড়িয়ে দেয়।
আজকের ভাগ্যের রং পাথরের নীল।
Lucky Color: SlateBlue — #6A5ACDএক গোপন কথা চুপ করে অপেক্ষা করে, শুধু আপনার ধৈর্য চায়।
উত্তর নীরব পায়ে আসবে।