মহাযাজিকার পেছনে দুটি স্তম্ভ নীরব বৈপরীত্যে ওঠে। প্রকাশের কিনারায় থমকে থাকা এক জগৎকে ঘিরে। তাদের মাঝে এক পর্দা ঝোলে, ফল আর সূক্ষ্ম চিহ্নে সূচির কাজ। তার ভাঁজ ওপারে যা আছে তার গোপন কথা লুকায়। তিনি শান্তিতে বসেন, পা স্থির জলের তলে। কোলে অক্ষর-আঁকা এক পুঁথি বন্ধ থাকে। ভিতরের বুদ্ধি সেই মুহূর্তের অপেক্ষায়, যখন কেউ গ্রহণ করতে তৈরি। সব শান্ত, তবু না-বলা জ্ঞানের প্রতিশ্রুতিতে ভরা।
প্রাচীন হলঘরে যে গল্প প্রতিধ্বনি তোলে, সেখানে লুকানো ঝরনা আছে। চুনাপাথরের খাড়ার নিচে গুঁজে রাখা জলের কুণ্ড। এমন কুণ্ডের তল ঝুঁকে থাকা পাথরের নিচে শান্ত পড়ে। আকাশকে ফেরায়, যেন স্বচ্ছ কাচের এক টুকরো। সেখানকার বাতাস সবসময় ঠান্ডা, গ্রীষ্মেও। দিনের শুরুতে কুয়াশা ওঠে, পাথর ধরে কুণ্ডলী হয়। সেই গোপন জায়গায় জল শতকের স্মৃতি ধরে রাখে। পায়ের শব্দে বিচলিত নয়। সূর্য ছোঁয় না, শুধু সেই সংক্ষিপ্ত ক্ষণ ছাড়া, যখন উপরের পাথরের ফাঁক দিয়ে আলো গলে আসে।
অনেক আগে এশিয়ার উঁচু মরু পেরোনো পথিকেরা মরূদ্যানে থামতেন, বুনো শালভিয়া আর ঘাসে ঘেরা। সেখানে ভোরে আকাশ জমির ওপর খুলত। দিনের তাপ আসার আগে বাতাসে এক ঠান্ডা ঝুলত। বণিক আর তীর্থযাত্রীরা সূক্ষ্ম চিনামাটির কাপ থেকে পান করতেন। প্রতিটি কাপ দূরের আকাশের রঙের প্রলেপে। এক রং, যা যত্নশীল রসায়ন আর কারিগরের ধৈর্যশীল হাত থেকে আসত। এই কাপে জুঁই চায়ের উপর বাষ্প কুণ্ডলী হত, ভোরের আগের নিস্তব্ধতায় মেশে। কাপ নিজে ছোট, তবু দূর রাজবংশের চিহ্ন বয়ে বেড়াত। রেশমপথ ধরে নীরবে বয়ে আনা জ্ঞানের স্মারক।
ঘরে, দেবদারুর সিন্দুকে এক রেশমের ওড়না গুছিয়ে ভাঁজ করা। বুনন সূক্ষ্ম, ছুঁতে ঠান্ডা। ওড়না একসময় তাঁর ছিল, যিনি শান্ত সকাল আর একা পড়ার চর্চা দাম দিতেন। দিন তখনো শুরু হয়নি, কাঁধে ঝুলিয়ে পরা হত। সেই ঘণ্টায়, যখন জানালার কাচে শিশির জমত, আর জগৎ নিস্তব্ধ লাগত। পাথরও আছে, পুরনো আয়নার খাঁচে আর গলার দুলে বসানো। নদীতে গড়া, সময়ে গড়িয়ে মসৃণ। কেউ কেউ বলে এমন পাথর স্বপ্ন ধরে রাখে। একটা সঙ্গে রাখা মানে এক গোপন কথা নিরাপদ রাখা, হৃদয়ের কাছে।
মহাযাজিকা নিজেকে চৌকাঠে রাখেন, ভিতরেও নন, ওপারেও নন। তাঁর উপস্থিতি উঁচু পাহাড়ের হ্রদের ভোরের বাতাসের মতো। কুয়াশা তল ধরে ভেসে বেড়ায়, সূর্যোদয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগে। কিছু বলার আগের দিনের নিস্তব্ধতা, পুঁথি খোলার আগে, যখন শুধু সবচেয়ে ভিতরের অন্তর্জ্ঞান উপস্থিত। বৃষ্টির পর মঠের উঠোনের এই আবহাওয়া। বাইরের জগৎ ধুয়ে পরিষ্কার, একমাত্র শব্দ পাথরে জলের মৃদু ঢেউ।
আজ আপনি খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে দিন শুরু করতে পারেন, ভোরের আগে ঠান্ডা স্যাঁতসেঁতে বাতাস নিতে। চিনামাটির কাপে চা ঢালুন, তার তলে জলের বিন্দু জমতে দেখুন, হাতে উষ্ণতা ধরুন। এক ওড়না ভাঁজ করে যেখানে বসেন সেখানে রাখুন, কথা বলার আগে অপেক্ষার দাম আর ধৈর্য মনে করিয়ে দিতে। পকেটে বা টেবিলে এক ছোট মসৃণ পাথর রাখুন। স্বচ্ছতা বা নীরবতা লাগলে তার কাছে ফিরুন।
আজকের ভাগ্যের রং ফিকে ফিরোজা।
Lucky Color: PaleTurquoise — #AFEEEEপ্রতিটি নীরব সকালে ধৈর্য আর লুকানো বুদ্ধি আপনার সঙ্গে।
সময় ঠিক না হওয়া পর্যন্ত গোপন কথা রাখা থাকে।