স্তম্ভের মাঝে মহাযাজিকা বসেন, অর্ধেক ছায়া আর অর্ধেক প্রতিশ্রুতি। তাঁর পেছনের পর্দা ঘন বোনা, ডালিমের ছাপ, আর সবচেয়ে ফিকে এক হাওয়ার ফিসফিস ছাড়া কিছু যায় না। কোলে এক পুঁথি। তার তল সবার জন্য বন্ধ, শুধু যাঁরা দীক্ষিত তাঁদের জন্য খোলা। আসনের নিচে জল একেবারে স্থির। ভোরের নির্জন পুকুরের অচ্ছুঁয়া মুখকে ফেরায়। এ কথার ছুটন্ত স্রোত নয়। অপেক্ষার নীরবতার অনড় গভীরতা। গোপন কথা বলার আগের মুহূর্ত।
এই ঘরের ওপারে, যত্নশীল হাত অনেক দিন ধরে যে বাগান দেখেছে, সেখানে গাছ দাঁড়িয়ে আছে, ডাল ভারী। তারা যে ফল বয়ে বেড়ায়, সন্ধ্যার মতো গাঢ়, ডিম্বাকার, ছুঁতে ঠান্ডা। এই গাছ দূর উপত্যকার পুরনো ফলের বাগানের। প্রাচীন দেশের মঠের কুঞ্জের, যেখানে নীরবতা অভ্যাস নয়, নিয়ম। কেউ কেউ বলে, এশিয়ার উচ্চভূমিতে এই গাছের প্রথমগুলো মন্দিরের কাছে লাগানো হয়েছিল। শিকড় পাথর আর দোআঁশের গভীরে। ডাল ঋতু আঁকে, আর প্রজন্ম তাদের ছায়ায় পেরিয়ে যায়। কিংবদন্তিতে এমন এক গাছ এক মন্দিরের কাছে গজিয়েছিল, যেখানে সাধকেরা ভাঁজ করা কাগজের চিরকুট ছালে গুঁজে দিতেন। প্রতিটিতে এক প্রশ্ন, যা তখনো জোরে বলা যায় না। ফল তুললে সবসময় সবচেয়ে নীরব অনুষ্ঠানের জন্য তুলে রাখা হত।
সন্ধ্যার রান্নাঘরে ফল যত্নশীল হাতে আধা করা হয়, আঁটি সরানো হয়। শাঁস বাটিতে রাখা হয়, চা-চামচের পাশে, আর দিদিমাদের লেখা পুরনো প্রণালীর পাশে, যাঁরা মাপতে মাপতে ফিসফিস করতেন। এই ফলের ঘন রস হাঁড়িতে ঘন হয়। মিষ্টির এক ফিকে মেঘ ছোট ঘর ভরিয়ে দেয়। তার গন্ধ কাঠের হাতায় থেকে যায়, যেন বাগানে কাটানো প্রতিটি গ্রীষ্ম মনে আছে। কখনো এক ফোঁটা চায়ের কাপে মেশানো হয়, স্বাদ গভীর করে। অথবা রুটির এক ফালিতে চামচ করে দেওয়া হয়, নীরব বিকেলের শেষ দাগাতে। কোণায় রান্নাঘরের চেয়ারের পিঠে এক ওড়না ঝোলে। সবচেয়ে নরম সুতোয় বোনা, আর সেই ফলের খোসার নির্যাসে রাঙানো। সন্ধ্যার আলো ধরলে মনে হয় কিছু চেপে রাখছে। এক গল্প, যা এখনো বলার জন্য তৈরি নয়।
অনেক আগে বণিকেরা এই ফলের ঝুড়ি কাফেলায় নিয়ে যেতেন। ঠান্ডা তৃণভূমি আর নদী-উপত্যকা পেরিয়ে, দূরের হাটের উদ্দেশে। বোনা কাপড়ে জড়ানো ফল মাসের পর মাস পথ টিকত। পথের শেষে মিষ্টির এক প্রতিশ্রুতি। হাটেই বণিকেরা একে খাবার আর ওষুধ দুই হিসেবে দিতেন। নীরব দুঃখ বা নিদ্রাহীনের প্রতিকার। বৈদ্যরা শুকনো ফুল ফুটন্ত জলে ভিজাতেন, হাড় বা কাঠ খোদাই করা কাপে ঢালতেন। স্বাদ মৃদু, কিন্তু কাজ ধীর আর নিশ্চিত। যেন অস্থির স্বপ্নের ওপর আলতো করে এক পর্দা টানা। অন্য জায়গায় শীতের উনুনে ডাল পোড়ানো হত। যে সন্ধ্যায় তুষার উঁচু হয়ে জমত, ঘরে এক সূক্ষ্ম গন্ধ ভরে যেত।
আজকের মতো এক দিনে আপনি ফলের ফালি গরম জলে ভিজিয়ে সেই রস খেতে পারেন, অন্য কারও গল্প পড়তে পড়তে। অথবা আঁটি মাটিতে পুঁতে বিশ্বাস করতে পারেন, ধৈর্য শিকড় আনবে। এই আঁশের ওড়নায় নিজেকে জড়িয়ে এমন এক চিঠি লিখতে পারেন, যা পাঠানোর ইচ্ছে নেই। অথবা এক পুরনো বাগানে যেতে পারেন, গাছের নিচে চুপ করে দাঁড়াতে পারেন, পাতা যা বলে না তা শুনতে।
আজকের ভাগ্যের রং আলুবোখারা।
Lucky Color: Plum — #DDA0DDনীরব প্রশ্ন ছায়াতে বিশ্রাম পাক।
গোপন কথা আপাতত অক্ষত থাকে।