হাত ধরাধরি করে মূর্তিরা এমন এক আকাশের নিচে দাঁড়ায়, যা একসময় উজ্জ্বল ছিল, এখন শেষের নিস্তব্ধতায় ম্লান। তাদের আঙুলের ডগা কাছে ভাসে, ঠিক মেশে না, যেন বাতাস নিজেই তাদের মাঝে ঘন হয়েছে। পায়ের কাছে যে বাগান একসময় ফুটেছিল, এখন শক্ত কাঁটা ডাঁটা আর খাড়া মাথায় ভরা, মৃদু কথায় বশে আসে না এমন গাছ। এই সীমা-রক্ষকদের মাঝে প্রতিটি পা সতর্ক, সাবধান। সীমা পাথর বা বেড়ায় নয়, কাঁটা পাতার বুনো জেদে। নিস্তব্ধতায় এক হাওয়া কেঁপে যায়, প্রতিটি ফুলের কষ্টে পাওয়া মুকুটের ধারে আটকায়, প্রতিজ্ঞাহীন মাটিতে বীজ ছড়ায়।
ওপারের খেতে দীর্ঘ রীতি এই জেদি ফুলকে অভিশাপও বলেছে, ওষুধও। গল্প আছে উচ্চভূমিতে গরু হারায়, অসাবধান কামড়ে মুখ রক্তাক্ত, তবু রাখালরা এই গাছের কচি হৃদয় সিদ্ধ করে ঝোল বানাতে শিখেছে, আগুনের পাশে চুপচাপ ভাগ করা তেতো খাবার। বসন্তে হাওয়া রুক্ষ হলে চাষিরা মোটা শণের কাপড়ে হাত মুড়ে সবচেয়ে পুরোনো ডাঁটা উপড়ে, নরম গজানোর জায়গা পরিষ্কার করে। তবুও প্রতিটি খেতের কিনারায় এক টুকরো না-কাটা রাখে, টিকে থাকার ছাড়, পথিককে ইশারা যে কোনো শেকড় মাটি থেকে জোর করে তোলা যায় না।
মুরের ওপর, পাথরের গাঁয়ের উপরে, এই গাছ ভিড় করে, ঠান্ডা বৃষ্টির বিরুদ্ধে নীরব এক সেনা। কোনো কোনো রাতে কুয়াশা তাদের মাথায় বসে, সূক্ষ্ম আঁশে শিশিরের মতো লেগে। বাতাস ভারী হয়, শব্দ চাপা পড়ে, ভেড়াও পাহাড়ের শুকনো দিকে থাকে। দূর শহরে তাদের আঁশ থেকে কাটা সুতো খসখসে কাপড় বানায়, টেকসই, কাজের চাদর আর হাটের বস্তার জন্য। দিদিমারা এখনো আলমারিতে শুকনো ডাঁটার এক আঁটি রাখে, গলাব্যথার কষায়ের জন্য ফুটন্ত জলে ভেজাতে, বা অস্থির স্বপ্ন আটকাতে গদির নিচে গুঁজতে।
এক প্রতিসাম্য আছে, যদিও অস্বস্তিকর, যারা পাশাপাশি দাঁড়ায় তাদের আর এই গাছের বাড়ার ধরনের মাঝে। কখনো পরিপাটি সারিতে নয়, সবসময় থোকায়, প্রতিটি ডাঁটা আলাদা তবু একসঙ্গে। কথা হোঁচট খায়, হাজার ছোট কাঁটায় আটকে। তবু যোগের তাগিদ থাকে। এক প্রতিবেশী আপনার দোরগোড়ার ঝুড়িতে এক ফুল রেখে যায়, সৌন্দর্যের জন্য নয়, স্মৃতির জন্য। এক শিশু রাস্তার ধার থেকে বীজ তোলে, হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়, কী শেকড় গাড়বে ভেবে।
আজ আপনি পরিত্যক্ত এক জমির ধার দিয়ে হাঁটতে পারেন, ধ্বংসস্তূপের ভেতর প্রথম কাঁটা মাথা গজিয়ে উঠতে দেখতে পারেন, অচ্ছুঁয়ে। গত বছর তোলা শিকড় দিয়ে তেতো এক কাপ বানিয়ে, যার কথাও আটকে গেছে, তার সঙ্গে চুপচাপ ভাগ করতে পারেন। পুরোনো এক চিঠির ভাঁজে চাপা এক ফুল গুঁজতে পারেন, যেদিন দূরত্ব নরম হবে তার অপেক্ষায়। বা সন্ধ্যা নামলে জানলার ধারে বসে, হাওয়ায় আসা নিস্তব্ধতা শুনতে পারেন, চুপচাপ বসতে দিয়ে, তাড়ায় ভরতে না গিয়ে।
আজকের ভাগ্যের রং কাঁটাফুল।
Lucky Color: Thistle — #D8BFD8কোনো কোনো সীমা ততক্ষণ টিকে, যতক্ষণ বীজ উড়ে না যায়।
প্রতিটি বিরতিতে ধৈর্য থাকতে পারে।