কার্ড ঘোরে, আর রাত অস্বচ্ছ, বদলানো হয়ে যায়। পুরোনো পাথরের সেতু ফুলে ওঠা কুয়াশার আড়ালে হারায়, কুকুরের চেনা ডাক নদীর ধারের প্রতিধ্বনি-ওঠা শান্তে ডুবে যায়। যেখানে নেকড়ে একসময় ছায়ায় বসেছিল, শুধু একটা স্যাঁতসেঁতে রেখা থাকে, যেন জন্তুটা জলার নলখাগড়া আর বেতগাছের তলায় জমা অগভীর জলায় মিলিয়ে গেছে। পৃথিবী এত গভীর শান্তে গলেছে যে হাওয়াও যেন দ্বিধা করে। পথের উপর চাঁদ ঢাকা, মেঘ শক্ত করে টানা, আর বুনো আর পোষার তফাত একই ভেজা মাটিতে চেপে গেছে।
এমন ভূমিতে সবকিছু স্লেট পাথরের ধৈর্য নেয়। জলের কিনারার পরিত্যক্ত কুঁড়ের ছাদের টালি দশকের বৃষ্টি আর তুষার সহ্য করেছে, তাদের খসখসে মুখ শিশিরে পিচ্ছিল, পুরোনো পায়ের ছাপের স্মৃতি নিয়ে। রাজমিস্ত্রিরা একসময় পাহাড়ের গায়ে কাটা খনন থেকে এই পাথর তুলত, প্রতিটি হাতে কেটে সাবধানে সারিতে বসাত, ঋতুর ভার আর প্রজন্মের যাওয়া সহ্য করার জন্য। সেই একই পাথর পুরোনো গ্রামের কুয়ো ঘিরে, তার গোল ঠোঁট হাজার হাতের ছোঁয়ায় মসৃণ, প্রত্যেকে বালতি নামায়, মেঘলা আকাশের এক আয়না তোলে। সন্ধ্যায় শিশুরা ঠান্ডা কিনারায় হাতের তালু চেপে ধরত, একে অন্যকে সাহস দিত নিচের অন্ধকার জলের ফিসফিস শুনতে, বিশ্বাস, কুয়ো তার ঠান্ডা গভীরে পুরোনো গোপন কথা রাখে।
কুঁড়ের ঠিক বাইরে পাহাড়ের গা রাখালদের একসময়ের পথের অবশেষে জড়ানো। কুয়াশাভরা সকালে ভেড়া তার অসমান কিনারা ধরে জড়ো হত, পশম ফোঁটায় ভারী, তাদের চলা শান্ত, শুধু শক্ত মাটিতে ক্ষুরের নরম টোকা। শান্ত আবহাওয়ায় রাখালের লাঠি শৈবাল-দাগানো চ্যাপটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে থাকত, এখন ঢেঁকিশাক আর বিছুটির নজরের বাইরে। কখনো কুয়াশা নিচু বসলে পুরোনো হাতিয়ারের রেখা দেখা যায়। ভুলে যাওয়া এক বাটালি, কোদালের এক অংশ, যারা পাহাড়ের হাড়কে আশ্রয় আর চুল্লিতে গড়েছিল তাদের ফেলে যাওয়া।
যে দিন বাতাস কুয়াশায় ঘন আর কিছুই নিশ্চিত নয়, গ্রাম আশ্রয়ের দিকে ঝোঁকে। নারীরা কাঁধে ভারী শাল টানে, শক্ত পাহাড়ি ভেড়ার পশম থেকে পাকানো মোটা সুতোয় বোনা। আগুনের পাশে কেতলি গুনগুন করে, তার ক্ষয়ে যাওয়া টিনের কিনারা চায়ের উষ্ণতা আর মাটির মগে মুঠো করা হাতের আরাম ধরে। চুল্লি নিজে খনন করা পাথরের টুকরোয় ঘেরা, প্রতিটি শ্রমের স্মৃতি, অন্ধকার ঠেকানোর আশায় একসঙ্গে পাতা। এমন রাতে লণ্ঠন জ্বালিয়ে জানালায় রাখা ঠিক, অনিশ্চিত অন্ধকারে পথ খুঁজে চলা পথিকদের জন্য আলো, তাদের জুতো শ্যাওলা-ধরা, বৃষ্টিতে ভেজা পথে ডুবে যায়।
এই ফেরা রাতের সঙ্গে মেলার উপায় আছে। শেষ বৃষ্টির পরের শান্তে গলি ধরে হাঁটা, কুয়োর ঠান্ডা পাথরে হাতের তালু রাখতে থামা, অথবা শাল জড়িয়ে জানালার পাশে বসা, দূরের প্যাঁচার ডাক শোনা। আপনি কেতলি চাপিয়ে বাষ্প কুণ্ডলী পাকিয়ে মিলিয়ে যেতে দেখতে পারেন, অথবা পাওয়া এক পাথর চুল্লিতে চেপে রাখতে পারেন, যারা আগে পথ গড়েছিল তাদের শান্ত স্মরণে।
আজকের ভাগ্যের রং ফিকে পাথরের ধূসর।
Lucky Color: LightSlateGray — #778899কুয়াশা বসে। নাম সরে যায়। কুয়ো মনে রাখে।