চাঁদহীন এক রাত চুপচাপ জলার উপর চেপে বসে, একসময় পাহাড়কে হ্রদ থেকে, বুনো কুকুরকে পোষা সঙ্গী থেকে আলাদা করা রেখা গিলে নেয়। এমন রাতে নলখাগড়ার মাঝের পথ অনিশ্চিত, আর দেখা আর দেখার সীমা ঘন কুয়াশায় গলে যায়। পা রাখার পাথর স্যাঁতসেঁতের এক চামড়ার তলায় হারায়, আর জলের ওপারে ডাকা ডুবুর পাখির গলা দূরের নেকড়ের চিৎকারে ঘোলা হয়ে যায়। নলখাগড়ার কাঁপুনির আড়ালে পৃথিবী সেই একই শান্তে মোড়া, যা একসময় সন্ধ্যায় পাথরের খননে ভর করত, যেখানে কাজের মানুষ হাতিয়ার নামিয়ে কাটা মুখে হাওয়ার নিচু গর্জন শুনত।
এই সময়ে স্লেট টালির এক ছাদ ভিতরের মানুষকে ঠান্ডা শিশিরের ঝরা থেকে আড়াল করে, সেই একই টালি প্রাচীন পাহাড় থেকে কাটা, যেখানে শৈবালের রেখা পুরোনো ক্ষতের উপর হাঁটে। বৃষ্টি এই ছাদের উপর চেপে বসে, স্থির আর নাছোড়, তার ছন্দ মধ্যরাতের পর গোলপাথরের রাস্তায় হারানো পায়ের ছন্দের প্রতিধ্বনি। দূরে এক চিমনির ছায়া না-নমানো আকাশের গায়ে ওঠে, উপরে এক-দুই কবুতর, তাদের পালক কালি আর সময়ে নিষ্প্রভ, দুর্বোধ্য চোখে দেখে।
আশ্রয়ের বাইরে রাস্তা ছড়িয়ে যায়, বহুদিন আগে হাতের গড়া পাথরের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে বাঁক নিয়ে। প্রতিটি চাঙড় কুয়াশাভরা সকালের স্মৃতিতে ভারী, যখন রাখালরা শ্যাওলা আর কুয়াশার নীরবতায় ঘেরা মাঠ দিয়ে পাল নিয়ে যেত। সমুদ্রের ধারের পুরোনো শহরে জেলেরা একসময় লণ্ঠনের আলোয় জাল জোড়া লাগাত, তাদের নৌকা নুড়িতে ছড়ানো সৈকতে তোলা, নুড়ি লোনায় কালো। এই আকাশের নিচে সমুদ্র নিজে না-বলা গোপনের আয়না হয়ে যায়, ঢেউ চুপচাপ ভেসে আসা কাঠ আর ভুলে যাওয়া জিনিসের ভাঙা খোলের উপর ভাঁজ হয়।
ভিতরে চুলার উপর এক হাঁড়ি টগবগ করে, ঢাকনা আস্তে খটখট করে। রাঁধুনি হাত বাড়ায় দূরের ছাদের মতোই পাথরে খোদাই এক হামানদিস্তার দিকে, শুকনো সুগন্ধি পাতা আর ছোট শঙ্কুফল পিষে মিহি গুঁড়ো করে। চুল্লি পাথরে গড়া, ছোঁয়ায় ঠান্ডা, শত শীতের দাগে খোদা, ধিকিধিকি কাঠের উষ্ণতা ধরে। টেবিলে এক পশমি চাদর ভাজ করা, বৃষ্টি থেকে তোলা ভেড়ার পশমে কাটা, তার বুনন এত ঘন যে রাতের বাতাস ঠেকাতে পারে।
বাইরের বাতাস আসা আবহাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ঘন। মেঘ মাথার উপরে স্তূপ হয়, তারা ঢেকে, আর ছাদের কিনারার নালা গুঁড়ি বৃষ্টির প্রথম স্রোত ধরে। দরজার পাশে ফেলে রাখা জুতো শক্ত হয়ে শুকায়, তাদের তলা একটানা, ফিসফিস গুঁড়ি বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পথের অবশেষে দাগ-ধরা। এ রাত জানলার কপাট আটকানোর, লণ্ঠনের সলতে ঠিক করার, বৃষ্টির ধাঁধা আর পাথরের গোপন কথা শোনার।
আজ ছাদের নিচে থামুন, টালিতে বৃষ্টি শুনুন, অথবা রাতের খাবারে স্বাদ দিতে পাথরের বাটিতে মশলা পিষুন। প্রতিবেশীর ছাদের পুরোনো স্লেটে আঙুল বোলান, অথবা অনেক ঋতু সহ্য করা চাদরে নিজেকে মুড়ুন। পকেটে এক নুড়ি রাখুন, নদী বা জোয়ারে মসৃণ, আর হাওয়া আর জলে ক্ষয়ে যাওয়া জায়গার শান্ত মনে রাখুন।
আজকের ভাগ্যের রং পাথরের ধূসর।
Lucky Color: SlateGray — #708090কুয়াশা যা খুশি নাম দিক। আজ রাতে পথ আপনাকে মনে রাখে।