মহাযাজিকা পাথরের স্তম্ভের মাঝে বসেন, কিন্তু আজ তাঁর দৃষ্টি কোলে সিল করা পুঁথিতে স্থির। পায়ের কাছের চেনা অর্ধচন্দ্র শুকনো। এক নীরব খিলান, যে মাটির ওপর একসময় নদী ফিসফিস করত। তাঁর পেছনের বোনা কাপড়, লতায় সূচির কাজ, মোটা লাগে। যেন লুকানো দরজা চাপা দিতে বাড়ছে। বাতাসে অনুপস্থিতি ধূপের চেয়ে ভারী ঝোলে। যা একসময় চুপ করে অন্তর্জ্ঞান থেকে হৃদয়ে যেত, এখন ইট আর গাঁথুনির আড়ালে আটকা। এমন হাতে ধরা, যারা গোপন কথা ছাড়তে চায় না।
জাগ্রোস পাদদেশের প্রাচীন শহরে নারীরা পাহাড়ি ফুলের মজ্জা থেকে নির্যাসে রাঙানো পোশাক পরতেন। এত গভীর এক ছায়া যে সূর্যের আলো গিলে ফেলে। মন্দিরের খতিয়ানে নিষিদ্ধ নামের জন্য রাখা কালির একই রং। সেই রঞ্জক দুর্লভ ছিল। শীতের জানালায় টানা ভারী পর্দার মখমলে চাপা হত, যাতে বাইরের জগৎ উঁকি দিতে না পারে। ভুলে যাওয়া গ্রন্থাগারের পণ্ডিতেরা ডায়েরি ছাগলের চামড়ায় বাঁধতেন, সেই একই নির্যাসে পাকা। পাতা এমন প্রশ্নে খাড়া, যা তাঁরা জোরে উত্তর দিতে সাহস পেতেন না। গোপন কথা বেশি দিন রাখলে নিজেই এক জিনিস হয়ে যায়। এক তালা, এক সীমানা, ঘন মখমলের পর্দার এক দেয়াল।
তৃণভূমির কিনারায় প্রথম বজ্রঝড়ের পর বুনো ডিজিটালিস ফোটে। তাদের ঘণ্টা ঝোলে, ভারী আর অপঠনীয়, সেই মাটির ওপর যেখানে পুরনো কুয়ো মরশুমের জন্য সিল। কেউ সেখান থেকে জল তোলে না। জল নিজের গল্প নিজের কাছে রাখে। অনেক আগে ছোট গ্রামের বৈদ্যরা সেই পাপড়ি ওষুধের জন্য থেতলাতেন, কিন্তু প্রণালী লুকিয়ে রাখতেন। শুধু বন্ধ আলমারি আর সন্ধ্যার নীরবতার ওপর ভরসা, জ্ঞান নিরাপদ থাকবে। ঠান্ডা পরিষ্কার রাতে দূরের মেরুজ্যোতি কখনো দিগন্তের উপরে একই ছায়াময় তীব্রতায় কাঁপত। এত দুর্লভ যে রাখালেরা একে নীরব বার্তাবাহক বলত। তবু আকাশও তার অর্থ খুলত না।
ভিতরে উনুন ঠান্ডা। পাকা আলুবোখারার এক বাটি, সন্ধ্যার ঝড়ের মতো ছোপ-ধরা আর গাঢ়, জানালার ধারে অচ্ছুঁয় বসে। রান্নাঘরের হামানদিস্তায় এক মশলার শেষ অবশিষ্ট। একসময় মনে করা হত মনের দরজা ফুসলিয়ে খোলে, এখন গুঁড়ো করে শক্ত ছিপি-আঁটা বোয়ামে রাখা। ঘর শান্ত। পরিবারের গলা সাবধান, যে ঘরে গোপন কথা ডানা গজাতে পারে সেখানে ছড়িয়ে না পড়ে। কেউ বিছানার ভারী লেপ মসৃণ করেন। মা থেকে মেয়ের হাতে আসা নকশায় বোনা। প্রতিটি সুতো এক প্রশ্ন, যা পুরোপুরি কখনো করা হয়নি। বাইরে হঠাৎ এক ঝাপটা মাচার লতা থেকে পাপড়ি গড়ায়। তাদের পড়া কেউ লক্ষ করে না, শুধু উল্টানো হাঁড়ির নিচে থেকে দেখা একাকী বিড়াল ছাড়া।
আজ সিল করা কিছু বয়ে বেড়ানো সহজ। না-পাঠানো এক চিঠি, না-বলা এক প্রশ্ন, ডায়েরির পাতায় চাপা এক স্মৃতি। সকালের নিস্তব্ধতায় ভাঁড়ারের পেছনে একসময় লুকানো বোয়াম থেকে চা বসান। তার গন্ধ উঠুক, তারপর চুপ করে মিলিয়ে যাক। এক পাথরের উল্টোপিঠে এক ধাঁধা লিখে বাগানের কিনারায় বসান, যেখানে শুধু সবচেয়ে সাহসী আগন্তুক উল্টাতে পারে। বংশের ওড়না কাছাকাছি ছোট সেলাইয়ে মেরামত করুন। সুতো কাপড়ের ভিতর দিয়ে যাক, মহাযাজিকার আগলে রাখা দৃষ্টির মতো নীরব। অথবা শুধু ভারী পর্দার ধুলো ঝাড়ুন। আপনার হাত যা অদেখা থাকে তার ভার মনে রাখুক।
আজকের ভাগ্যের রং গাঢ় লালচে বেগুনি।
Lucky Color: DarkMagenta — #8B008Bযা আপনি নিজের জন্য রাখেন, তাতে শক্তি আছে।
কিছু দেয়াল তাদের গোপন কথার আকার ধরে রাখে।