পুঁথি তাঁর কোলে পড়ে আছে, ছোঁয়া হয়নি। সিল করা ঢাকনার নিচে লিপি লুকানো। দুই পাশের স্তম্ভ আর পথ দাগায় বলে মনে হয় না। এখন এক চৌকাঠকে ঘিরে, যা স্মৃতি ছাড়া সবার জন্য বন্ধ। একসময় তাঁর পেছনের জল গোপন কথা ফিসফিস করত। আজ রাতে তা সন্ধ্যার এক নীরব খাল, বয় না, শুধু উপরের ভারী আকাশকে ফেরায়। বাতাস চেপে রাখা জ্ঞানের নিস্তব্ধতা ধরে। যেন চাঁদের দৃষ্টিও ভিতরের দিকে ঘোরানো, জমা মেঘের আড়ালে পর্দায় ঢাকা।
সন্ধ্যার কিনারায় এক বাগান কল্পনা করুন। আইরিস আর হায়াসিন্থ নিজেদের ভিতরে ভাঁজ হয়েছে। রাতের চাপে পাপড়ি গাঢ় হয়। এই বাগানে শতবর্ষী মঠের এক স্লেটের টালি দিনের শেষ আলো ধরে। বৃষ্টি আর নীরব পায়ের বছরে তার তল ক্ষয়ে গেছে। এমন টালি একসময় গ্রন্থাগারের ছাদ ছিল, যেখানে ভিক্ষুরা তালা-আঁটা সিন্দুকের ওপর ঝুঁকতেন। চাবি পোশাকের নিচে শিকলে রাখা। সেই সিন্দুকের ভিতরের কথা প্রতিটি চোখের জন্য ছিল না। তাদের বুদ্ধির ভার কালির মতোই নীরবতায় মাপা।
দূর দেশে এক নদীর পাথর, উত্তরের খাঁড়ি থেকে তোলা, জানালার ধারে বসালেও জলের ঠান্ডা ধরে রাখে। মসৃণ, ঘন, গাঢ়। হাতের তালুর নিচে এক গোপন কথা। ধরে রাখা মানে সন্ধ্যার ঝড় আসার নিস্তব্ধতা অনুভব করা। হাওয়া জোরে ওঠে, গ্রামের মানুষকে ঘরের ভিতরে তাড়ায়। দরজা বন্ধ, কপাট টানা, উনুন শান্ত হাতে দেখা হয়। উপকূলের এক বন্দরে জেলেরা জাল গুটিয়ে নৌকা ঢেউআটকানির দিকে ঘোরান, ঝড়ের লণ্ঠন জ্বলে। কাচের মুখ ম্লান জ্বলে। নৌকা আলতো দোলে, এখন বাঁধা। দিনের কাজ শেষ। জল অস্থির, পড়া যায় না।
ঘরের ভিতরে এক পুরনো পশমের ওড়না দেবদারুর আস্তর দেওয়া সিন্দুকে অপেক্ষা করে। ঋতুর পর ঋতু ভাঁজ, শুধু ঠান্ডা হাওয়া জানালায় চাপ দিলে বের করা হয়। উনুনের পাশে বলা গল্প এখনো মনে আছে। টেবিলে কার্ড মেশানো, আর নিরাপদ পথের জন্য ফিসফিস করা প্রার্থনা। উঁচু পাহাড়ে রাখালের চাদর, হাতে বোনা আর ভারী, এক বেঞ্চের ওপর ঝোলানো। তার আঁশ পাহাড়ি কুয়াশা মনে রাখে, আর দীর্ঘ ঘণ্টা, পথ বাঁক খেয়ে মিলিয়ে যেতে দেখা। দিগন্ত কুয়াশায় হারায়। এখানে জ্ঞান কাছে রাখা হয়। বইয়ের ভিতরে চাপা এক পরিবারের প্রণালী, দেয়ালের কাঠের আড়ালে লুকানো এক চাবি, কখনো পাঠানো হয়নি এমন এক চিঠি।
আজ আপনি এক কেতলি চা বসিয়ে জানালার ধারে চুপ করে বসতে পারেন। হাত মাটির কাপের চারপাশে, স্থিরতা বসুক। এক ডায়েরি তালা দিয়ে বন্ধ করতে পারেন, সময় ঠিক না হওয়া পর্যন্ত পাতা না খোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আরেকজন বাগান থেকে এক মসৃণ পাথর নিয়ে পকেটে রাখতে পারেন। মনে করিয়ে দেয়, কিছু কথা আপাতত না-বলাই ভালো। অথবা সন্ধ্যায় খালের ধারে হাঁটুন, শান্ত জল শুনুন। জেনে রাখুন, আজ রাতে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর লাগে না।
আজকের ভাগ্যের রং গাঢ় পাথরের নীল।
Lucky Color: DarkSlateBlue — #483D8Bকিছু গোপন কথা চেপে রাখার চেয়ে বেশি আগলায়।
পুঁথি বন্ধ থাকলে যে নীরবতা বসে, তাতে ভরসা রাখুন।