মহাযাজিকার কোলে পুঁথি অপঠিত থাকে। কালি চিরকাল তার নলখাগড়ার পাতার মাঝে চাপা। তাঁর পেছনের পর্দা, যা একসময় পথ ছিল, শহরের দেয়ালের পাথরে শক্ত হয়ে গেছে। দুই পাশের প্রশ্নে উদাসীন। তাঁর কুণ্ড, যা একসময় ঝিকিমিকি করত, নিচু মেঘের আকাশের নিচে স্থির পড়ে আছে। জলের তল কোনো প্রতিবিম্ব দেয় না, শুধু শীতের কুয়াশার মতো গভীর এক নিস্তব্ধতা। একসময় এক ফিসফিস চৌকাঠ পেরোতে পারত। এখন নীরবতা নিজেকে জমায়। সব উত্তরহীন জিনিসের সন্ধ্যা থেকে বোনা এক শাল।
পুরনো মহল্লার কিনারায় এক বাড়ি। বছরের বৃষ্টিতে ছাদের টালি ম্লান। ছোট বাগানে নদীর পাথর পথের কিনারা ধরে, প্রতিটি অগণিত পায়ে মসৃণ। উনুনে এক ঢালাই লোহার কেতলি বসে, শেষ আঙার মরার পর উনুনের ছাইয়ের একই ছায়া। বাতাস সেই রাতের স্মৃতি ধরে রাখে, যখন গোপন কথা বলা হত। এখন কোনো গলা আসে না। শুধু ঘড়ির টিকটিক, আর বাইরে শুকনো পাতার খসখস। জগতে শীতের ভোরের নিস্তব্ধতা। আকাশ কাছে, মাটি শান্ত, চিমনি থেকে পাতলা ধোঁয়া ছাড়া কিছু নড়ে না।
শহরের ওপারে এক পর্বতমালা ওঠে, ভোরের কুয়াশায় মুখ ঢাকা। চূড়া আর উপত্যকা একে অপরের মধ্যে মেশে। রেখা অনিশ্চিত। দূরত্ব উজ্জ্বলতায় নয়, ঘনত্বে দাগানো। প্রাচীন পাথরে পুরনো বৃষ্টির ধীর বসায়। পথিকেরা শৈলশিরার পথ ধরে যান। পুরনো রাস্তার ধুলোয় জুতো ঢাকা, ঝড়ের পর লেগে থাকা ঠান্ডার বিরুদ্ধে চাদর শক্ত করে টানা। পুরনো খনিমজুরেরা এই ভূদৃশ্য ভালো চিনতেন। তাঁদের হাতিয়ার এখন পাহাড়ের পাদদেশের চালায় বিশ্রাম নেয়। কোদাল আর বেলচা সেই সন্ধ্যার রঙে গাঁথা, যে পাথর তাঁরা একসময় চিরতেন। প্রতিটি শিরা নিজেকে খোলেনি। প্রতিটি গোপন কথা পথ ছাড়েনি।
নদীর বাঁকে উইলো জলের দিকে ঝোঁকে। ছাল স্যাঁতসেঁতে আর ঠান্ডা, ছায়া লম্বা। জেলেরা, পায়ের নিচের পাথরের মতো ধৈর্যশীল, নীরবে জাল মেরামত করেন। স্রোতে ভরসা, আকাশে নয়। সূর্য প্রতিদিন ফোটে না। কখনো কুয়াশা সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে। বুনো পায়রাও চালের নিচে চুপ করে জমে। পালক কাছে চেপে, চোখ সতর্ক আর স্থির।
ঘরের ভিতরে বিছানার পাদদেশে এক পশমি কম্বল ভাঁজ করা। মুরভূমি আর রেলস্টেশনের চাতাল পেরোনো যাত্রার অবশিষ্ট। জানালার ধারে এক লোহার চাবি। তার খাঁজ এখন ঋতুর পর ঋতু না-ঘোরানো। টেবিলের খতিয়ান বন্ধ। পাতা অমীমাংসিত হিসাবের ধুলোয় ঘন। তার উপরে রাংয়ের খাঁচে এক পুরনো ছবি। মুখ ছবি তোলার দিক থেকে ঘোরানো, চোখ খাঁচার ওপারে অদেখা কিছুর দিকে তোলা। এ সেই ঘণ্টা, যখন না-বলা কথার চেয়ে ভারী। গোপন কথা আছে, কিন্তু তা তলের ঢেউ নয়, কুয়োর তলার পাথর।
এই জায়গায় চলতে আপনি পুরনো চাবি এতক্ষণ পরিষ্কার করতে পারেন, যতক্ষণ না শুধু ছোঁয়ায় তার আকার খোলে। অথবা ঢালাই লোহার হাঁড়িতে রুটি বানাতে পারেন, রান্নাঘরে নীরবতা উঠুক। সন্ধ্যায় বাগানে পা দিয়ে নদীর পাথর এমন নকশায় সাজান যা শুধু আপনি জানেন। অথবা মেঘলা আকাশের নিচে হাঁটুন, স্থিরতায় বাস করা গল্প শুনতে।
আজকের ভাগ্যের রং ম্লান ধূসর।
Lucky Color: DimGray — #696969নীরবতা নিজের ধরনের উত্তর ধরে রাখে, এই ভরসা রাখুন।
যা লুকানো, তা এমন জায়গা হোক যেখানে আপনি থাকতে পারেন।