মহাযাজিকা পর্দার আড়ালে বসেন, পুঁথি হাতে। কিন্তু আজ পর্দা এক পাথরের দেয়াল, আর পুঁথি অপঠিত, ভিতরের দিকে ঘোরানো, নীরব। সোজা জগতে তাঁর মন্দির রহস্যের মাঝের এক পথ। পেছনের নদী ঝিকিমিকি এক নিমন্ত্রণ। উলটোতে নদী মেঘলা আকাশের নিচে জমে আছে। মন্দিরের পাথর নীরব। বাতাস এমন প্রশ্নে ভারী, যা কখনো উত্তর খুঁজে পায় না। তিনি নীরবতার রক্ষক হয়ে ওঠেন। যেখানে জ্ঞান ভাগ করা হয় না, স্লেটের আড়ালে সিল করা।
স্লেট একসময় খাড়া আর পাহাড় থেকে কাটা হত। আশ্রয় আর সহ্য খোঁজা হাতে খাদান করা। ছাদের মিস্ত্রি এই টালি বসান, একটার ওপর আরেকটা, নিরন্তর বৃষ্টি থেকে ঘর আড়াল করতে। ওয়েলসের গ্রামে ছাদ কুয়াশা ধরে। সকালে মৃদু, অবিরাম গুঁড়ি বৃষ্টি ঢাকলে তাদের তল পিছল। পুরনো স্কুল, রেলস্টেশন, আর খামারবাড়ি এই একই ঢাল বয়ে বেড়ায়। বয়স আর ব্যবহারের ভার বাতাসে ঘন, যেন প্রতিটি টালি হাওয়া থেকে লুকানো গোপন কথা মনে রাখে। এমন জায়গা হৃদয় সহজে খোলে না। স্লেটের নিচের ঘর ম্লান আর নিস্তব্ধ। পায়ের প্রতিধ্বনি শুষে নেয়, কুয়াশার মতো।
পড়ার ঘরের কোণে এক স্লেটের ফলক দাঁড়িয়ে আছে। মুখ মুছেছে, কিন্তু কখনো পুরো পরিষ্কার নয়। অর্ধেক মনে থাকা খড়ির দাগ ফাঁকে থেকে যায়। ফলক লেখার নিমন্ত্রণ, কিন্তু খড়ির কাঠি ভেঙে গেছে, পাঠ অসমাপ্ত। ছাত্ররা একসময় উত্তরের জন্য ফলকের দিকে তাকাত। এখন শুধু যা লেখা হতে পারত তার ভূত দেখে। মন ভিতরের দিকে ঘোরে, প্রশ্নকে চক্রাকারে ঘোরে, ভেদ করতে পারে না। এ সেই জ্ঞান যা চেপে রাখা। হারায়নি, নাগালের ঠিক বাইরে লুকানো।
শান্ত এক বিকেলে বৃষ্টি ধীর, অনড় নকশায় পড়ে। এমন বৃষ্টি, যা পুরনো পাথরের গ্রামের হাড়ে গলে ঢোকে। উপরের আকাশ এক ফিকে, মেঘলা গম্বুজ। উজ্জ্বলও নয়, পুরো ছায়াও নয়। উনুনে কেতলি গরম হতে জানালার কাচে নিঃশ্বাস কুয়াশা হয়। বাইরে পাহাড় ঝুলে থাকে, কুয়াশা আর দূরত্বে শৈলশিরা নরম। ভেড়া পাথুরে ঢালে নীরবে চরে। ভেজার বিরুদ্ধে তাদের লোম ঘন। জগৎ ঝুলন্ত লাগে, নিস্তব্ধতায় ধরা। যেন গলা আর গল্প ছাদের নিচে, দেয়ালের আড়ালে সরে গেছে। পরিষ্কার আকাশের অপেক্ষায়।
এই আবহাওয়ায় মহাযাজিকা বন্ধ ফটক। যে জল নিজের গোপন কথা ধরে রাখে। তিনি না-পড়া খতিয়ান, যে দরজা নতি মানে না। জ্ঞান অপেক্ষা করে, মেঘের আড়ালের সূর্যের মতো। কখন ফুটবে, অনিশ্চিত। তবু নীরবতার মধ্যেও মৃদু কাজ আছে, যা দিনে সান্ত্বনা আনতে পারে। আপনি এক খড়ির কাঠি ধার করে চুপ করে এক প্রশ্ন লিখতে পারেন, উত্তর না এলেও। আরেকজন স্লেটের তল মসৃণ করতে পারেন, নতুন ভাবনার জন্য তৈরি করে, যা থেকে যায় তা মুছে। তৃতীয়জন জানালায় দাঁড়িয়ে ভেজা ছাদ দেখতে পারেন, নিস্তব্ধতায় শ্বাস নিয়ে। ধৈর্য নিজেই বুদ্ধি হোক। অথবা যত্নশীল হাতে আপনি ছাদের হারানো টালি জোড়া দিতে পারেন। মনে রেখে প্রতিটি টুকরো একসঙ্গে ঢাল আর স্মৃতি।
আজকের ভাগ্যের রং ফিকে পাথরের ধূসর।
Lucky Color: LightSlateGray — #778899ধৈর্য গভীর হোক। কখনো গোপন কথা অপেক্ষার মধ্যেই।