নলখাগড়ার পুঁথি তাঁর হাতের নিচে বন্ধ থাকে। কথা তালাবন্ধ, পায়ের কাছের সাধকের থেকে সরিয়ে রাখা। পেছনে পর্দা ভারী ঝোলে, ভাসে না, স্থির। কুণ্ডে চাঁদের প্রতিবিম্ব পাতলা এক আস্তরণের নিচে হারায়। এ প্রশ্নের পরের মুহূর্ত, যখন উত্তর আসে না। যখন গুহ্যবাণীর মুখ নীরব, আর ঘর সন্ধ্যা জমায়। পর্দার ওপারের জগৎ নিষিদ্ধ যতটা নয়, অনড় ততটা। উত্তরহীন জিনিসের নীরবতা বাতাস ভরায়, শীতের কুয়াশার মতো।
এক ছাদের টালি আছে, সীমান্তের জমি থেকে কাটা, যা অনেক মঠ আর ক্ষয়ে যাওয়া প্রহরীমিনারের মুকুট। নির্জনতার জায়গার মাথায় বসে। এমন হাতে গড়া, যারা গল্প ভিতরে রাখতে জানে। বৃষ্টি পড়ে, খাঁজ ধরে গড়ায়, যা বলা হতে পারত তা বয়ে নিয়ে যায়, বদলে চালের কিনারায় জমে। উত্তরের এক জেলের গ্রামের কিনারায় দীর্ঘ বিকেলে সমুদ্র আর আকাশ কাছে চেপে আসে, খোলা জল থেকে কুয়াশা ভেসে আসে। নৌকা বন্দরে ফেরে। খোলে ঝড়ের স্মৃতি, দড়ি পিছল, পাথরের ঘাটে খুলে পড়ে। সব চাপা। গলা, পায়ের শব্দ, দূরের বাতিঘরের ঘণ্টা। জেলেদের কোট, বছরের নোনা আর স্যাঁতসেঁতে ভারী আর ক্ষয়ে যাওয়া, দরজার মুখে ঝোলে। সহ্য আর নীরব শ্রমের সাক্ষ্য।
পুরনো রান্নাঘরে, যেখানে উনুন নিচু জ্বলে, দেয়ালে এক চাপ পাথরের ফলক হেলান দেওয়া। প্রজন্মের আঙুলের ছাপে রান্নার কথা ম্লান। পাথর একসময় পাহাড়ের ঢাল থেকে চেরা, বয়ে এনে নামানো, রুটি মাখার তল বা ছুরি শান দেওয়ার জায়গা। এখন তার দাগ অর্ধেক পড়া যায়। খাবার আর কথার স্মৃতি সময়ে ক্ষয়ে পাতলা। কাছেই এক হাঁড়ির হাতল, ব্যবহারে মসৃণ, ছুঁতে একটু ঠান্ডা, গত রাতের ঝোলের উষ্ণতা ধরে রাখে। বাইরে মেঘ দিগন্তে থেকে যায়, কাছে চেপে, দিনের পর দিন সূর্যহীন। তাদের ভার চেপে রাখা বৃষ্টির ইঙ্গিত।
প্রাচীন লেখকেরা মঠে গোপন কথা স্তরে স্তরে স্লেটের নিচে রাখতেন। প্রতিটি লেখা ফলক আরেকটির নিচে লুকানো। কিছু দূর উপত্যকায় সম্পত্তির রেখা আর প্রাচীন রাস্তা দাগানো সীমানাপাথর এই একই পাথর থেকে খোদাই। শতকের হাওয়ায় তাদের লিপি অর্ধেক মুছে। পথিকেরা যায়, কিন্তু কম থামে। শ্যাওলার উপরে যা থাকে শুধু তা পড়ে। শহরে এক সেলাইয়ের কারিগর কাঁচি শানপাথরে ধার করেন, দাদুর কাছ থেকে পাওয়া। ধার তীক্ষ্ণ, কিন্তু বানানোর গল্প বলা হয় না।
যে সন্ধ্যায় জগৎ অভেদ্য লাগে, দরজা বন্ধ হয়, কথা গড়ে ওঠে না, আপনি ছাদের টালির কিনারা ধরে আঙুল বোলাতে পারেন। তার ঠান্ডা দানা, আর বানানোর ধৈর্য অনুভব করতে। পুরনো পাথরের ফলকে রুটি বানাতে পারেন, ভার দিনের উদ্দেশ্য ধরে রাখুক। কুয়াশায় বসা নিস্তব্ধতায় বন্দরের দেয়াল ধরে হাঁটা নীরব সঙ্গ দিতে পারে। দূরের জলের শব্দ চাপা, কিন্তু স্থির। অথবা শানপাথরে রান্নাঘরের ছুরি ধার করতে পারেন। সহজ কাজে মন দিন। স্বচ্ছতা নিজের সময়ে আসে, এই বিশ্বাস রেখে।
আজকের ভাগ্যের রং পাথরের ধূসর।
Lucky Color: SlateGray — #708090ধৈর্য আশ্রয়, আর নীরব সহ্য এক ধরনের বুদ্ধি।