কলসি পাথরের উপর নামিয়ে রাখা, তাদের ঠোঁট সেখানে বিশ্রাম নেয় যেখানে জলার কিনারা একসময় জলে ঝকঝক করত। মাটি ঠান্ডা আর শুকনো। জলার তল মিলিয়ে গেছে, প্রতিফলনের শুধু এক স্মৃতি রেখে। উপরে রাতের আকাশের খিলান প্রশস্ত আর নীরব আলোয় ছড়ানো, কিন্তু তাদের ঝিকিমিকি আগের মতো মাটির তলে ছোঁয় না। এখানকার বাতাস চাপা, আর হাওয়া কিছুতেই থেমে গেছে। কার্ডের দিগন্তের প্রতিশ্রুতি এখন দূর বাতির এক রেখা, ছোঁয়া যায় না, তবু ধৈর্য নিয়ে জ্বলে। এই জায়গার হৃদয় জল আর আকাশের কিনারা, যেখানে আকাঙ্ক্ষা উপরে তাকায় আর তারাকে দূর পায়, তাদের গান ধুলোয় প্রতিধ্বনি তোলে না।
এ বৃষ্টির রাত নয়, স্থিরতার, যখন শহর নিজেকে এমন আকাশের নিচে পায় যা কাছে আর ভারী চেপে ধরে। জলার কিনারা অনেক জায়গায় মেলে। ফেলে দেওয়া এক সাধারণ স্নানাগারের দোরগোড়ায় যেখানে তালাবন্ধ লোহার ফটকের পিছনে ছায়া জমে, অথবা উৎসবের লণ্ঠন নেভানোর পর নদীর পাড়ে, বাঁধকে নীরবতায় রেখে। পৃথিবী দেরি সময়ের নিস্তব্ধতায় গড়া, যখন এক নাবিক জাহাজের পাটাতন থেকে উপরে তাকায়, পুরোনো জাহাজকে পথ দেখানো নক্ষত্রমণ্ডলী চেনে। এমন সময়ে গির্জার গম্বুজ আকাশে সরে যায়, পাথরের কাজ গভীরের সঙ্গে মেশে, আর শহরের গুঞ্জনও উপরের ভারে চাপা পড়ে।
দূর উত্তরের গ্রামের গল্পে মধ্যরাতের পর ফেরা জেলেদের কাহিনি আছে, তাদের নৌকা সরু পাহাড়ি খাঁড়ির মধ্যে গড়ায়। জল কালির মতো আর পাহাড় শুধু রেখা। তাদের স্ত্রীরা উনুনের ধারে অপেক্ষা করে, ম্লান আলোয় কম্বলে সুতোর কাজ করে, প্রতিটি সেলাই উঁচু, জানা যায় না এমন খিলানের নিচে নিরাপদ পথের প্রার্থনা। রাত এক ছাদ, এক সীমা, আর এক ঢাল। সে সন্ধ্যার মঞ্চের উপর টানা মখমলের পর্দাও, যখন শুধু ঘড়ির মুখের ঝলক, এক বুকের পিন, বা পালিশ করা জুতো অন্ধকারের মধ্যে চলা মানুষের উপস্থিতি ফাঁস করে। সময় ঝোলানোর অনুভূতি আছে, গোপন কথা ধরা এক নিস্তব্ধতা, সেই মুহূর্ত যখন শেষ ট্রেন তারের নিচ দিয়ে পেরোয় আর রেল এক মুহূর্ত ঝিক করে চাঁদের অনুপস্থিতিতে মিলিয়ে যাওয়ার আগে।
জলার কিনারা শুকানো মানে আশার হাতিয়ার থেমে আছে বা ফেলে রাখা। কলসি অপেক্ষা করে। যে হাত তাদের বয়ে নিয়েছিল তা কোলে ভাঁজ, বা অনুপস্থিত। ইতিহাসে এমন সময় ধৈর্য চাইত। পরিষ্কার আকাশের অপেক্ষায় নাবিক-পথপ্রদর্শক, ঠান্ডা যন্ত্রের পাশে বসা জ্যোতির্বিদ, নিস্তব্ধতায় এক কথার জন্য কান পেতে থাকা কবি। মঠে প্রার্থনার জোয়ার এক ঘণ্টার জন্য নামে। শহরের ভাড়াঘরে কল বন্ধ করে চা-পেয়ালা সরিয়ে রাখা হয়। ঝড় পেরিয়েছে বা এখনো আসেনি, তাই দোরগোড়ায় কেউ নীরবতা থেকে কী উঠতে পারে তার জন্য শোনে।
আজ রাত খোলা জানালার ধারে স্থির থাকার ভালো সময়, বেতার মিনারের দূর মিটমিট আলো গুনতে। আপনি অন্ধকার বোনা এক গলাবন্ধ বের করে কাঁধে বিশ্রাম দিতে পারেন, তার নিস্তব্ধ ভার টের পেতে। দূরে থাকা কাউকে এক ছোট চিরকুট লিখতে পারেন, আপনার কথা রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে যাক। অথবা, শুধু দিনের শেষে টেবিল গুছিয়ে, গেলাস আর কলসি নামিয়ে, জলার কিনারা থেকে এক পা পিছিয়ে, অপেক্ষার সঙ্গে শান্তিতে।
আজকের ভাগ্যের রং মধ্যরাতের নীল।
Lucky Color: MidnightBlue — #191970এ গোধূলি আর ভোরের মাঝে ধরা এক গল্পের ছায়া।
আজ রাতে সে আপনার সঙ্গ দিক।